সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
অনুকূল মাটি ও কৃত্রিম পরাগায়ন পদ্ধতির সফল প্রয়োগে নরসিংদীতে বাণিজ্যিকভাবে কাঁকরোল চাষ করে ব্যাপক সাফল্য পাচ্ছেন স্থানীয় কৃষকেরা। জেলার ছয়টি উপজেলার বিস্তৃত কৃষিজমিতে গ্রামীণ কৃষিজীবীরা উন্নত জাতের এই গ্রীষ্মকালীন সবজির আবাদ সম্প্রসারিত করেছেন। রোপণের মাত্র দুই মাসের মাথায় ফলন তোলা শুরু হওয়ায় এবং স্থানীয় আড়তসহ দূরদূরান্তের বাজারে চাহিদা থাকায় প্রতি মৌসুমে জেলাজুড়ে কাঁকরোল বেচাকেনা বাবদ কোটি কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে। উৎপাদিত এই মানসম্মত সবজি দেশের প্রধান শহরগুলোর চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে।
নিয়মিত ভোরে পুরুষ ফুলের পরাগরেণু স্পর্শ করানোই ফলন বৃদ্ধির মূল রহস্য। কাঁকরোল মূলত কিউকারবিটেসি বা কুমড়া পরিবারের গুল্মজাতীয় লতানো উদ্ভিদ, যার বৈজ্ঞানিক নাম মোমরডিকা ডায়োইকা। এই উদ্ভিদের একই গাছে স্ত্রী ও পুরুষ ফুল ফোটে না বলে প্রাকৃতিকভাবে পরাগায়ন অত্যন্ত সীমিত হয়। এই সংকট কাটাতে নরসিংদীর চাষিরা গাছ রোপণের দেড় থেকে দুই মাসের মাথায় প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে সদ্য ফোটা পুরুষ ফুল সংগ্রহ করেন। পুরুষ ফুলের পাপড়িগুলো সাবধানে মুড়িয়ে ভেতরের পুংকেশরটি সযত্নে স্ত্রী ফুলের গর্ভকেশরে ঘষে স্পর্শ করান। একটিমাত্র সতেজ পুরুষ ফুল দিয়ে অন্তত ছয়টি স্ত্রী ফুলে কার্যকরভাবে কৃত্রিম পরাগায়ন ঘটানো সম্ভব হয়। জমিতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পেতে স্ত্রী গাছের পাশাপাশি অন্তত পাঁচ থেকে দশ শতাংশ পুরুষ গাছ রাখা বাধ্যতামূলক।
মাঠ নির্বাচনের ক্ষেত্রে পানি জমে না এমন উঁচু ও মাঝারি দোআঁশ এবং এঁটেল-দোআঁশ মাটি কাঁকরোল আবাদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ। মধ্য এপ্রিল থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত জমিতে চারা রোপণ বা বীজ বপনের মধ্য দিয়ে এই সবজির মৌসুম শুরু হয়। সফল পরাগায়নের পর ফুল ঝরে গিয়ে দ্রুত ফলের বৃদ্ধি ঘটে এবং মাত্র বারো থেকে পনেরো দিনের মধ্যেই তা পূর্ণাঙ্গ আকার পায়। চারা রোপণের ৬০ থেকে ৭০ দিন পর থেকেই জমি থেকে পুষ্ট কাঁকরোল কাটা শুরু করা যায়। জেলায় কৃষকেরা প্রধানত আসাম, মণিপুরি, মুকুন্দপুরি ও মধুপুরি জাতের কাঁকরোল আবাদ করছেন। এসব উন্নত জাত চাষ করে কৃষকেরা প্রতি বিঘা জমি থেকে গড়ে দশ মণ পর্যন্ত ফলন পাচ্ছেন। সবজি হিসেবে সুস্বাদু হওয়ার পাশাপাশি এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ফসফরাস, ক্যারোটিন, ভিটামিন বি এবং খাদ্যআঁশ।
মাঠ থেকে কাঁকরোল সংগ্রহের মূল কর্মব্যস্ততা চলে মধ্য জুলাই থেকে মধ্য সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তবে আশ্বিন ও কার্তিক অর্থাৎ অক্টোবর পর্যন্ত জমিতে একটানা কাঁকরোলের জোগান অব্যাহত থাকে। বিশেষ করে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র এই তিন মাসে ফসল তোলা ও মোকামে বিক্রির কাজে চাষিদের সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি থাকে। জমি থেকে তোলা কাঁকরোল গেরস্থ বাড়িতে এনে ওজন মেপে ঝুড়িতে সাজিয়ে ভোরে ভ্যানযোগে স্থানীয় হাটবাজারে পাঠানো হয়।
পাইকারি মোকামে প্রতি কেজি কাঁকরোল মানভেদে ২৫ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আড়তে সংগ্রহের পর আকার অনুসারে গ্রেডিং ও প্যাকিং করে তা ট্রাকে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় চালান করা হয়। কুমড়া পরিবারের সবজির মধ্যে স্বাদে ও চাহিদায় শীর্ষে থাকা নরসিংদীর এই পুষ্টিকর কাঁকরোল স্থানীয় অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন