সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০১:০০ পিএম
আমদানিনির্ভর ফলের বিকল্প হিসেবে উন্নত জাতের হলুদ মাল্টা চাষ করে বাণিজ্যিক কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন যশোরের এক প্রবীণ চাষি। জেলার মণিরামপুর উপজেলার মুজগুন্নি গ্রামের আব্দুল করিম দীর্ঘ এক যুগ ধরে সাইট্রাস জাতের ফল চাষাবাদ করে আসছেন। পূর্বে দেশে সবুজ রঙের মাল্টা চাষ হলেও বিদেশি ফলের মতো উজ্জ্বল হলুদ রঙের মাল্টা ফলিয়ে তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমানে তাঁর খামারে চার বছর বয়সী প্রতিটি গাছ থেকে গড়ে দেড় মণ করে ফলন মিলছে, যার বাজারমূল্য গাছ প্রতি প্রায় সাড়ে সাত হাজার টাকা।
উন্নত জাতের বারি মাল্টা-এক সঠিকভাবে পরিচর্যা করলে দেশেও বিদেশি ফলের চেয়ে বেশি মিষ্টতা নিশ্চিত করা সম্ভব। বাংলাদেশে সাইট্রাস চাষের অগ্রদূত হিসেবে পরিচিত এই কৃষক প্রায় বারো বছর পূর্বে মাত্র এক হাজার ৫০০ টাকা পুঁজি ও বন্ধুর উপহার দেওয়া কয়েকটি চারা নিয়ে ফল চাষ শুরু করেছিলেন। উত্তরবঙ্গের মতিউর রহমান, মেহেরপুরের ইসমাইল এবং বরিশাল অঞ্চলের বিভূতি কুমার সরকারের সাথে সমন্বয় রেখে তিনি এ চাষের সূচনা করেন। বর্তমানে তাঁর বাগানের আয়তন দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশের হিসেবে মোট ২৫ বিঘা। এর মধ্যে একটি নির্দিষ্ট পাঁচ বিঘা আয়তনের প্লটেই এক হাজারের বেশি সাইট্রাস গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ১৮০টি চায়না কমলা ও বাকিগুলো উন্নত জাতের হলুদ মাল্টা।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত বারি মাল্টা-এক জাতের নিচের অংশে পয়সার মতো গোলাকার চিহ্ন থাকে। তবে খাঁটি বারি-এক মাল্টার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি কিছুটা ডিম্বাকৃতির লম্বাটে হয় এবং এর খোসার গায়ে হালকা ডোরাকাটা রেখা দৃশ্যমান থাকে। ডিসেম্বর মাস পার হলে এই ফল সম্পূর্ণ পেকে উজ্জ্বল হলুদ রূপ নেয় এবং প্রচুর রসালো মিষ্টি স্বাদে রূপান্তর ঘটে। কৃষি গবেষণাগারের পরীক্ষায় দেখা গেছে, সাধারণ আমদানি করা মাল্টায় মিষ্টির মাত্রা বা টিএসএস যেখানে ৯ থেকে ৯ দশমিক ৫ শতাংশ থাকে, সেখানে এই বাগানের গাছে তা ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। নতুন বাগান করার ক্ষেত্রে প্রতি ৩৩ শতকের এক বিঘাতে নয় থেকে দশ ফুট দূরত্ব বজায় রেখে ১৩০ থেকে ১৩৫টি চারা রোপণ করা যায়। বাজারে উচ্চতা ও বয়সের ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি উন্নত চারার দাম ১০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। রোপণের প্রথম দুই বছর গাছে বাণিজ্যিক ফল নেওয়া উচিত নয়। এই মধ্যবর্তী সময়ে জমিতে ছায়া তৈরি করে এমন ধান, পাট বা পেঁপে বাদে অন্যান্য যেকোনো শাকসবজি সাথী ফসল হিসেবে চাষ করে খামারের পরিচালন ব্যয় পুরোপুরি তুলে নেওয়া সম্ভব।
সাইট্রাস আবাদের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক ও স্থানীয় হুমকি হলো সাইট্রাস গ্রিনিং বা হুয়াংলংবিং রোগ। এই ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগটি মূলত সাইলিড পোকার মাধ্যমে একটি অসুস্থ গাছ থেকে সুস্থ গাছে সংক্রমিত হয়। রোগটি বিস্তার রোধে প্রতি ১৫ দিন পর পর বাগানজুড়ে অনুমোদিত কার্যকর বালাইনাশক স্প্রে নিশ্চিত করলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
অর্থনৈতিক দিক থেকে চার বছর বয়সী একটি গাছ থেকে দেড় থেকে তিন মণ পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়। বর্তমান পাইকারি বাজারে মাল্টা কেজি প্রতি ১৩০ টাকা অর্থাৎ প্রতি মণ প্রায় পাঁচ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নতুন একটি বিঘা থেকে দুই বছর পর প্রথম সংগ্রহেই প্রায় ১০০ মণ ফল পাওয়া সম্ভব, যা প্রারম্ভিক মৌসুমে কম দামে মণ প্রতি তিন হাজার টাকায় বিক্রি করলেও অন্তত তিন লাখ টাকা নগদ আয় নিশ্চিত করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পরবর্তী বছরগুলোতে ফলন ও আর্থিক রিটার্ন প্রতি মৌসুমে দ্বিগুণ আকারে বাড়তে থাকে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন