সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
আমেরিকান জাতের উচ্চফলনশীল স্ট্রবেরি চাষ করে গ্রামীণ বাণিজ্যিক কৃষি অর্থনীতিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছেন চুয়াডাঙ্গার এক প্রগতিশীল কৃষি উদ্যোক্তা। জেলার জীবননগর উপজেলার মানিকপুর গ্রামের কৃষক সজল আহমেদ মাল্টা, কমলা, কুল ও পেয়ারার সমন্বিত বাগানে সাথী ফসল হিসেবে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে স্ট্রবেরির আবাদ সম্প্রসারিত করেছেন। চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে পঞ্চাশ হাজার স্ট্রবেরির চারা রোপণ করে তিনি প্রতিদিন ভোরে ফল সংগ্রহ করছেন। আমেরিকান ফেস্টিভাল ও আমেরিকান কার্নিভাল জাতের চারা রোপণ করে প্রতি বিঘায় ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ টাকার ফল বিক্রির মাধ্যমে সব খরচ বাদ দিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা নিট মুনাফা ঘরে তুলছেন তিনি।
উন্নত টিস্যু কালচার চারা ও সঠিক জাত নির্বাচনই ফলন বিপর্যয় এড়ানোর মূল চাবিকাঠি। উদ্যোক্তা জানান, স্ট্রবেরি মূলত শীতকালীন উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফসল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে রোপণের পর গাছ পাঁচ থেকে সাত মাস পর্যন্ত বেঁচে থাকে। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মূল জমিতে চারা রোপণের মাত্র এক মাস বিশ দিন পর গাছে ফুল ও ফল আসতে শুরু করে এবং দুই মাসের মাথায় পূর্ণাঙ্গ ফসল সংগ্রহ শুরু হয়। প্রতিটি গাছে গড়ে আঠারো থেকে চল্লিশটি পর্যন্ত ফল ধরে। আমেরিকান ফেস্টিভাল জাতের প্রতিটি ফলের ওজন গড়ে সত্তর থেকে আশি গ্রাম হওয়ায় মাত্র ষোলোটি ফলেই এক কেজি ওজন পূর্ণ হয়। অপরদিকে দেশীয় বারি-এক ও বারি-দুই জাতের ফল আকারে অত্যন্ত ক্ষুদ্র এবং প্রতি কেজিতে প্রায় ত্রিশটি ফলের প্রয়োজন হয়।
বাগান বিন্যাসের ক্ষেত্রে তিন ফুট চওড়া পলিথিন মালচিং পেপার ব্যবহার করে বেড তৈরি করা হয়। বেড থেকে বেডের মধ্যবর্তী দূরত্ব রাখা হয় বারো ইঞ্চি এবং একই বেডের ওপর দুটি সারির ব্যবধান থাকে দশ ইঞ্চি। সারিতে চারা থেকে চারার পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখা হয় ছয় ইঞ্চি। এই পরিকল্পিত বিন্যাসে প্রতি ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে প্রায় দশ হাজার স্ট্রবেরির চারা রোপণ করা সম্ভব। মালচিং ব্যবহারের ফলে মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষিত থাকে, আগাছার উপদ্রব কমে এবং ফল সরাসরি মাটির সংস্পর্শে না এসে পচনের হাত থেকে রক্ষা পায়। শীতকালীন ঘন কুয়াশায় পাতা পোড়া বা ডাল ঝলসে যাওয়া রোগ থেকে গাছকে সুরক্ষিত রাখতে ম্যানকোজেব ও কার্বেনডাজিম গ্রুপের ছত্রাকনাশক নিয়মিত স্প্রে করতে হয়। তাছাড়া ফল ধরার সময় আকস্মিক ধকল বা গাছের ঝিমিয়ে পড়া প্রতিহত করতে কাসুগামাইসিন গ্রুপের ওষুধ প্রতি সপ্তাহে একবার ব্যবহার করলে চারা তরতাজা ও সতেজ থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে বারি জাতের বিশ হাজার চারা রোপণ করে রোগবালাই ও ক্ষুদ্রাকৃতির কারণে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়লেও ভারত থেকে সংগৃহীত আমেরিকান জাতের ত্রিশ হাজার টিস্যু কালচার চারায় আশাতীত ফলন এসেছে। প্রতিটি সুস্থ আমেরিকান ফেস্টিভাল গাছ থেকে পুরো মৌসুমে এক কেজির বেশি ফল পাওয়া যায়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে এক বিঘা জমিতে স্ট্রবেরি চাষে চারা সংগ্রহ, মালচিং পেপার, সার, সেচ, বালাইনাশক ও শ্রমিকের মজুরিসহ মোট চার লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। প্রতিদিন সকালে উত্তোলিত তাজা ফল গ্রেডিং ও বিশেষ প্যাকেটজাত করে সরাসরি রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জের পাইকারি বাজারে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমান পাইকারি মোকামে এ-গ্রেডের স্ট্রবেরি প্রতি কেজি ছয়শত পঞ্চাশ টাকা এবং বি-গ্রেডের ফল প্রতি কেজি চারশত পঞ্চাশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফল বিক্রির আয়ে সাথী ফসলের জমিতে থাকা মূল পেয়ারা ও কমলা বাগানের দীর্ঘমেয়াদি লালনপালন ব্যয় উঠে এসে কৃষকের হাতে সরাসরি বড় অঙ্কের নিট পুঁজি সঞ্চিত হচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন