রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
থাই পেয়ারায় বাজিমাত

থাই পেয়ারা চাষে বছরে ৫৫ লাখ টাকা বিক্রির সাফল্য

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ০১:২৬ পিএম

থাই পেয়ারা চাষে বছরে ৫৫ লাখ টাকা বিক্রির সাফল্য

উন্নত জাতের থাই পেয়ারা চাষ করে বাণিজ্যিক কৃষি অর্থনীতিতে অভাবনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ঝিনাইদহের এক প্রবীণ চাষি। জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ত্রিলোচনপুর গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা খবির হোসেন প্রায় আঠারো বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন এই বিশাল বাণিজ্যিক ফলের বাগান। সাদা ফাইভ এবং বাছাইকৃত গোল্ডেন এইট জাতের পেয়ারার নিবিড় আবাদে চলতি মৌসুমেও বাগানে উপচে পড়া ফলন এসেছে। গত বছর ষোলো বিঘা জমি থেকে ৫৫ লাখ টাকার বেশি মূল্যের পেয়ারা বিক্রি করেছিলেন তিনি। প্রায় বিশ বছরের ফল চাষের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এই কৃষক সঠিক জাত নির্বাচন ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে সফল খামারির রোল মডেল হয়ে উঠেছেন।

মাটি নির্বাচন এবং সুনির্দিষ্ট ছাঁটাই কৌশলের ওপরই বাণিজ্যিক পেয়ারার ফলন নির্ভর করে। প্রচলিত থাই পেয়ারার আদি ফাইভ জাতের ফলের ওজন কখনো কখনো বারোশত গ্রাম পর্যন্ত হলেও তাতে নিচের দিকে কালো দাগ বা স্পট তৈরি হতো এবং চামড়ায় দাগের কারণে বাজারমূল্য কমে যেত। সেই দুর্বলতা কাটিয়ে এই উদ্যোক্তা উন্নত ও সম্পূর্ণ মসৃণ সাদা ফাইভ জাতের আবাদ সম্প্রসারিত করেছেন। এই পেয়ারা দেখতে যেমন ধবধবে সাদাটে ও চকচকে, তেমনি এর গায়ে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দাগ থাকে না। প্রথম বছরে ফলের গায়ে সামান্য খাঁজ বা বিট দেখা দিলেও দ্বিতীয় বছর থেকে ফল সম্পূর্ণ গোলাকার ও মসৃণ রূপ পায়। বাজারে এই জাতটি বিভিন্ন এলাকায় মিশরি ফাইভ বা সুপারটেন নামে বিক্রি হলেও স্থানীয়ভাবে এটি সাদা ফাইভ হিসেবে সুপরিচিত।

বর্তমানে পাঁচ বছর বয়সী এই বাগানের প্রতিটি গাছে ফলের এমন প্রাচুর্য দেখা যাচ্ছে যে ফলের অতিরিক্ত ভারে ডালপালা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। গাছের শাখাগুলোকে রক্ষা করতে বাঁশের চটা ও খুঁটি দিয়ে নিবিড় ঠেকনা দিতে হচ্ছে। প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে একশত বিশ ক্যারেট বা প্রায় ৬০ মণ তাজা পেয়ারা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাইকারি মোকামে প্রতি মণ পেয়ারা এক হাজার চারশত থেকে এক হাজার পাঁচশত টাকায় বিক্রি হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় চুরাশি হাজার টাকার ফসল বিক্রি হচ্ছে। পেয়ারার ধারাবাহিক সরবরাহের কারণে জমিতে কোনো বিরতি ছাড়াই একটানা কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন ভোরে ফল তোলা সম্ভব হচ্ছে। পেয়ারা চাষে সফল হতে হলে পানি জমে থাকে এমন পান্তা মাটি সম্পূর্ণ পরিহার করতে হয়। যেসব দোআঁশ বা এঁটেল মাটিতে সহজে পানি জমে থাকে না এবং দ্রুত রোদ ও বাতাস প্রবেশ করে, এমন উঁচু জমিও পেয়ারার জন্য সবচেয়ে আদর্শ। সবজি আবাদে ফুল আসার সময় প্রচুর সার বা ভিটামিন প্রয়োগের রীতি থাকলেও পেয়ারার ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণ বিপরীত। গাছে যখন প্রচুর ফুল ফোটে, তখন অতিরিক্ত সার বা ভিটামিন স্প্রে করলে ফুল ঝরে পড়ে ফলন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গাছ গঠনের প্রথম দিকে ১৫ দিন অন্তর হালকা সার প্রয়োগ করতে হলেও পূর্ণাঙ্গ গাছে ফলের উপস্থিতির অনুপাত দেখে সুষম সার ব্যবহার করতে হয়।

গাছ প্রতি নিয়মিত ডগা ছাঁটাই করাই পেয়ারার প্রচুর কুঁড়ি ও ফুল আসার অন্যতম মূল রহস্য। প্রতিটি নতুন ডগা এক ফুটের বেশি বড় হতে না দিয়ে অগ্রভাগ ছেঁটে দিলে সেখান থেকেই নতুন শাখার সাথে প্রচুর ফুল জন্ম নেয়। গাছের প্রাথমিক বৃদ্ধিতে একবার ডিএপি সার প্রয়োগের পর নিয়মিত ইউরিয়া, টিএসপি, পটাশ এবং বছরে দুই থেকে তিনবার বোরন সার প্রয়োগ করা হয়। গাছে ফলের ভার বেশি থাকলে বিঘা প্রতি টিএসপি ৩০ কেজি বা এক বস্তা পর্যন্ত এবং ইউরিয়া ও পটাশ ১০ কেজি করে দেওয়া হয়। একটি পেয়ারা বাগান সাধারণত পাঁচ থেকে ছয় বছর পর্যন্ত বাণিজ্যিক ফলন দিয়ে থাকে। এরপর গাছ কেটে এক বছরের জন্য বরই বা অন্যান্য ফসল আবাদ করে মাটির উর্বরতা ফিরিয়ে পুনরায় নতুন পেয়ারার বাগান গড়ে তোলার পরামর্শ দেন এই অভিজ্ঞ চাষি।