সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৫৫ এএম
শীতকালীন রবি মৌসুমে উন্নত জাতের ফুলকপি আবাদ করে মাঠের পর মাঠ সবুজে ভরিয়ে তুলেছেন রাজবাড়ীর সবজিচাষিরা। জেলার সদর, বালিয়াকান্দি, কালুখালী, পাংশা এবং গোয়ালন্দ উপজেলার বিস্তৃত কৃষিজমিতে বাণিজ্যিকভাবে এই সবজির চাষ হচ্ছে। আবাদ শুরুর তিন মাসের মাথায় উৎপাদন ব্যয়ের প্রায় দ্বিগুণ অর্থ ঘরে ফেরায় স্থানীয় কৃষকদের কাছে এটি অত্যন্ত লাভজনক অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। জেলায় ফুলকপির পাশাপাশি বাঁধাকপি, ওলকপি এবং সাথী ফসল হিসেবে টমেটোর আবাদও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পরিকল্পিত সেচ ও সঠিক পরিচর্যায় এবার বাম্পার ফলন এসেছে মাঠে। রবি মৌসুমে ফুলকপির বীজতলায় বীজ বপন শুরু হয় মূলত ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে। উঁচু ও আয়তাকার বীজতলায় বিশেষ খাঁজকাটা তক্তা দিয়ে পরিপাটি গর্ত তৈরি করে বীজ বপন করা হয়। প্রতি হেক্টর জমিতে আবাদের জন্য জাতভেদে সাড়ে তিনশত থেকে সাড়ে সাতশত গ্রাম বীজের প্রয়োজন পড়ে। নিয়ন্ত্রিত রোদ, বাতাস ও ঝাঝরি দিয়ে নিয়মিত পরিমিত পানি নিশ্চিত করলে তিন থেকে চার দিনের মধ্যেই চারা অঙ্কুরিত হয়। চারায় ছয় থেকে সাতটি পাতা গজালে অর্থাৎ চারা তোলার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ দিন হলে তা মূল জমিতে রোপণের উপযোগী হয়। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ মাসে মূল জমিতে চারা রোপণ করেন কৃষকেরা। সারি থেকে সারির দূরত্ব রাখা হয় প্রায় দুই ফুট এবং সারিতে চারা থেকে চারার দূরত্ব থাকে দেড় ফুট। শিকড় যাতে কোনোভাবেই বেঁকে বা মুচড়ে না যায়, সেজন্য অত্যন্ত সতর্কতার সাথে চারা বসানো হয়। শীতকালীন শুষ্ক মৌসুমে ভালো ফলনের জন্য রোপণের পর প্রথম চার থেকে পাঁচ দিন এক দিন অন্তর এবং পরবর্তীতে আট থেকে দশ দিন পর পর নিয়মিত সেচ দিতে হয়। মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে নালার মাধ্যমে সুষম পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
আবহাওয়া ও মাটির চরিত্র ভেদে আগাম জাতের জন্য দোআঁশ এবং নাবি জাতের জন্য এঁটেল-দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। জমি তৈরির সময় ও চারা রোপণের পর কয়েক কিস্তিতে ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, বোরাক্স ও পচা গোবর সার প্রয়োগ করতে হয়। চারা রোপণের আট থেকে দশ দিন পর প্রথম কিস্তি, পঁচিশ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ দিন পর শেষ কিস্তির সার উপরিপ্রয়োগ করা হয়। একই জমিতে সাথী ফসল হিসেবে অনেক কৃষক ভাদ্র-আশ্বিন মাসে আগাম জাতের টমেটো রোপণ করেন। বাঁধাকপির আগাম জাত অক্টোবর-নভেম্বরে এবং নাবি জাত ডিসেম্বরে রোপণ করা হয়। ওলকপি রোপণের দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যেই মাঠ থেকে তোলা যায় এবং হেক্টর প্রতি এর ফলন মেলে প্রায় ৩০ টনের মতো। চারা রোপণের ৪৫ থেকে ৫৫ দিনের মধ্যে ফুলকপির পুষ্পমঞ্জুরি দৃশ্যমান হয়। পাতার ঘেরাটোপে সাদা মঞ্জুরি যত বেশি ঢাকা থাকে, সূর্যালোক সরাসরি না লাগায় ফুলকপি তত বেশি ধবধবে সাদা ও উজ্জ্বল হয়। পুষ্পমঞ্জুরি পরিপক্ব হওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যেই তা বাজারজাতকরণের উপযোগী হয়। স্থানীয় দেশি জাতের মধ্যে অগ্রদূত, মাঘী, অগ্রহায়ণ ও পৌষালী এবং হাইব্রিড বা বিদেশি জাতের মধ্যে কিরণ, মারিয়াম, স্নোবল, স্নোহোয়াইট ও স্নোকুইনসহ অর্ধশতাধিক জাতের ফুলকপি চাষ হচ্ছে। সাধারণ জাতের ফুলকপি ওজনে ৬০০ থেকে ৭০০ গ্রাম হলেও হাইব্রিড জাতের প্রতিটি ফুলকপি ৮৫০ গ্রাম থেকে এক হাজার গ্রাম পর্যন্ত ভারী হয়।
রাজবাড়ীর হাটবাজার ও মোকামগুলোতে ভোর থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকারদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। প্রতি হেক্টরে আগাম জাতের ফুলকপি ১২ থেকে ১৫ টন এবং নাবি জাতের ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ২৮ টন পর্যন্ত ফলন মিলছে। ডিজিটাল স্কেলে পরিমাপ করে মণ হিসেবে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ফুলকপি ও অন্যান্য কপি কেনাবেচা হচ্ছে। মৌসুমে দেশে প্রায় ২৩ হাজার হেক্টর জমি থেকে প্রায় তিন লাখ টন ফুলকপি উৎপাদিত হয়। শাকসবজি উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় এবং কেবল ব্রকলি ও ফুলকপি উৎপাদনে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে, যার ধারাবাহিক সমৃদ্ধিতে রাজবাড়ীর চাষিদের অবদান অনন্য।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন