সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
নেত্রকোনার পূর্বধলায় বাঁশের মতো দীর্ঘ ও নিরেট কাঠামোর এক ব্যতিক্রমী হাইব্রিড আখ আবাদ করে কৃষি অর্থনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন স্থানীয় উদ্যোক্তা। উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের এনামুল ইসলাম মামুন তার ফলবাগান এবং সীমানা প্রাচীর ঘেঁষা পতিত জমিতে এই জাতের আখের নিবিড় আবাদ গড়ে তুলেছেন। প্রচলিত দেশীয় কিংবা ফিলিপিনো কালো আখের চেয়ে এই জাতটি তুলনামূলকভাবে দ্রুত বর্ধনশীল এবং মাত্র দশ থেকে বারো মাসের ব্যবধানে গাছগুলো গড়ে প্রায় আঠারো থেকে বিশ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে ওঠে। বর্তমানে তার খামারে প্রায় পঁয়ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার ফলনশীল আখ মজুত রয়েছে।
প্রতিটি ঝাড়ে একশর বেশি আখ উৎপাদন করে জাতটি নতুন বাণিজ্যিক সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। উদ্যোক্তা জানান, দীর্ঘ সাত বছর ধরে পেঁপে ও লেবুসহ বিভিন্ন কৃষিজাত ফসল আবাদ করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত দরপতনে তাকে বড় ধরনের আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে। কোনো কোনো মৌসুমে পেঁপে কেজি প্রতি পাঁচ টাকা এবং লেবু মাত্র পঁচিশ পয়সায় বিক্রি করতে গিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছিল। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর তিনি বারোমাসি এই বিশেষ হাইব্রিড জাতটির সন্ধান পান। এই আখের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমের বাধ্যবাধকতা নেই। বাজারে তাৎক্ষণিক চাহিদা না থাকলেও জমিতে আখ নষ্ট হয় না, বরং দিন দিন এর উচ্চতা, রস ও মিষ্টির ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে।
এই আখের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এটি দুই বছর পর্যন্ত জমিতে সতেজ রাখা যায়। গাছে কোনো ধরনের ফুল আসে না এবং অভ্যন্তরীণ অংশ কখনো ফাঁপা হয় না বা রস শুকিয়ে যায় না। আস্ত চিবিয়ে খাওয়ার উপযোগী নরম আঁশের পাশাপাশি এটি থেকে প্রচুর পরিমাণ রস আহরণ করা সম্ভব। একটি পূর্ণাঙ্গ আখ থেকে অন্তত দশ গ্লাস বিশুদ্ধ রস পাওয়া যায়। প্রতি গ্লাস রস বিশ টাকা করে বিক্রি করলে একটি আখ থেকেই প্রায় দুইশত টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। এমনকি প্রক্রিয়াকরণ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাবদ একশত টাকা বাদ দিলেও আখপ্রতি নিট একশত টাকা লাভ নিশ্চিত থাকে। বাগান বিন্যাসের ক্ষেত্রে ফলবাগানের চারপাশে তিন ফুট সীমানা বরাবর এই আখ রোপণ করে মূল ফসলের চেয়েও বেশি আর্থিক রিটার্ন নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। আম ও মাল্টা বাগানে ফল পেতে যেখানে দুই থেকে তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়, সেখানে মধ্যবর্তী ফাঁকা জমি ও সীমানা প্রাচীরে আখ লাগিয়ে মাত্র নয় থেকে দশ মাসের মাথায় ফসল তোলা যায়। মাত্র একটি চারা রোপণ করলে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে প্রথম দফায় চার থেকে আটটি নতুন ডগা গজায়, যা পর্যায়ক্রমে একটি ঝাড়ে রূপান্তরিত হয়ে একশর বেশি আখে পরিণত হয়। ফলে একই ঝাড় থেকে অসম উচ্চতার আখগুলো প্রতিদিন প্রয়োজনমতো কেটে বাজারে সরবরাহ করা যায়।
রোগবালাইয়ের দিক থেকে এই হাইব্রিড আখে জটিল কোনো রোগ সংক্রমণ দেখা যায় না। পরিচর্যার অংশ হিসেবে কেবল মাসে একটি বা দুটি অনুমোদিত স্প্রে প্রয়োগ করলেই ফলন অক্ষুণ্ণ থাকে। সঠিক পরিকল্পিত নকশা অনুসরণ করলে মাত্র এক শতক জমি থেকেই পাঁচশত পিস পুষ্ট আখ উৎপাদন করা বাস্তবসম্মত। পাইকারি মোকামে প্রতিটি আখ গড়ে একশত টাকায় বিক্রি হলেও এক শতক জায়গা থেকেই প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘরে তোলা সম্ভব। কৃষিকে আধুনিক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও নিয়মিত যত্নের ওপর জোর দিচ্ছেন এই কৃষক।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন