রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা

গাভীর খামারে শূন্য থেকে কোটিপতি সাটুরিয়ার ইতি

কৃষি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:৪৮ এএম

গাভীর খামারে শূন্য থেকে কোটিপতি সাটুরিয়ার ইতি

চরম পারিবারিক অনটন, শারীরিক আঘাত ও সামাজিক বঞ্চনা জয় করে একটিমাত্র অসুস্থ বাছুর থেকে অর্ধকোটি টাকার দুগ্ধ খামার গড়ে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন মানিকগঞ্জের তরুণী ইতি আক্তার। জেলার সাটুরিয়া উপজেলার দেলুয়া গ্রামের এই খামারি মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। বর্তমানে তার খামারে প্রায় ৩০টি উন্নত জাতের গরু রয়েছে, যার মোট আর্থিক মূল্য অর্ধকোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। দুগ্ধ খামারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ইতোমধ্যে জয়িতা ও জাতীয় যুব পুরস্কার অর্জন করেছেন।

পরিশ্রম আর সঠিক জাত নির্বাচনই বদলে দিয়েছে পুরো পরিবারের ভাগ্য।

ইতির পরিবারে ছিল মা-বাবা ও ছয় বোন। ২০১০ সালের দিকে রাতে বাজার থেকে ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের হামলায় তার বাবা গুরুতর আহত হন। শরীরের নয়-দশটি স্থানে হাড় ভেঙে তিনি প্রায় দুই মাস জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। উপার্জনক্ষম অভিভাবক পঙ্গু হয়ে পড়ায় পরিবারটিতে চরম খাদ্য সংকট নেমে আসে। সেই সময় তাঁদের একমাত্র অবলম্বন ছয়টি দুগ্ধবতী গরু খাদ্যের অভাবে ও অসুস্থতায় মাত্র ২৩ দিনের ব্যবধানে মারা যায়। দেড় মাস বয়সী একটি অসুস্থ বাছুর বেঁচে ছিল। টিন ও ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করে সেই বাছুরটির চিকিৎসা করানো হয়। দারিদ্র্যের চরম কষাঘাতে ইতি তখন বাজারে ঘুরে ঘুরে দুধ কেনাবেচা শুরু করেন। মাত্র ৫০০ টাকা ধার করে দুধ কিনতে গিয়ে বাজারে দরপতন হলে লোকসানের মুখে পড়েন তিনি। সেই দুধ বাকি বিক্রি করায় পাওনাদারদের অপমানজনক বাক্যবাণ সইতে হয় তাঁর পরিবারকে। এমনকি পায়ের নূপুর কেনার আশায় বর্গা নেওয়া দুটি ছাগলও লালনপালনের পর কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেইসব অবজ্ঞা ও গ্লানিই ইতিকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জেদ এনে দেয়।

বেঁচে যাওয়া বাছুরটির নাম ইতি রেখেছিলেন ‍‍`লক্ষ্মীসোনা‍‍`। সেটিকে পাঁচ বছর যত্ন নিয়ে বড় করে কোরবানির হাটে বিক্রি করা হয়। সেই অর্থ দিয়ে তিনি সাভারে গিয়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে তিন মাসের প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম প্রজনন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তিনি আরেকটি ষাঁড় গরু কেনেন, যার নাম দেন ‍‍`রাজাবাবু‍‍`। এরপর থেকে তিনি নিজেই খামারের গরুর প্রজনন ও চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করতে থাকেন। বর্তমানে তিনি নিজ এলাকার পাশাপাশি অন্য খামারিদেরও কৃত্রিম প্রজনন বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।

দুগ্ধ খামারের আসল লাভ দুধের চেয়ে উন্নত জাতের বাছুর উৎপাদনে বেশি আসে বলে মনে করেন ইতি। বর্তমানে তাঁর খামারে ১১টি গাভী থেকে দিনে প্রায় ১০০ লিটার বা আড়াই মণ দুধ পাওয়া যায়। বাজারে প্রতি লিটার দুধ ৮০ থেকে ৯০ টাকায় বিক্রি হওয়ায় দৈনিক আট থেকে নয় হাজার টাকা আয় হয়। এর মধ্যে দানাদার খাদ্য ও কাঁচা ঘাস বাবদ দৈনিক ব্যয় হয় প্রায় ছয় হাজার টাকা। প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা নিট মুনাফা থাকলেও বছর শেষে প্রতিটি গাভী থেকে প্রাপ্ত উন্নত বাছুরই খামারের মূল পুঁজি বাড়ায়। সম্প্রতি তিনি ১৬টি গরু বিক্রি করে প্রায় ২৯ লাখ টাকা আয় করেছেন।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এলডিডিপি প্রকল্পের আওতায় ইতি একটি আধুনিক উন্মুক্ত শেড পেয়েছেন। এছাড়া অর্জিত আয়ে তিনি ১০০ শতক জমিও কিনেছেন। খামারে গাভী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তিনি হলস্টেইন ফ্রিজিয়ানের খাঁটি জাত ও বংশমর্যাদাকে গুরুত্ব দেন। তাঁর খামারের একটি গাভী দৈনিক সর্বোচ্চ ৪০ লিটার পর্যন্ত দুধ দিয়েছে। গাভীর সুস্থতা রক্ষায় কাঁচা ঘাসের পাশাপাশি তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে ভুট্টার সাইলেজ তৈরি করেন। গর্ভকালীন তিন মাস থেকে কৃমিনাশক, আয়রন, ডিসিপি পাউডার ও ক্যালসিয়াম সরবরাহ করে বাছুরের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা হয়।