সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬, ১১:১২ এএম
দিনাজপুরের গ্রামীণ কৃষিতে বারোমাসি চায়না থ্রি সিডলেস লেবু চাষ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা আব্দুল মুহাইমিন। লেখাপড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মসজিদে ইমামতির দায়িত্ব পালন করে তিনি নিজ উদ্যোগে গড়ে তুলেছেন লেবুবাড়ি নামের সমন্বিত কৃষি প্রকল্প। ২০২০ সালের নভেম্বরের শেষভাগে পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা এই প্রকল্পে বর্তমানে পুরাতন বাগানের পাশাপাশি সাইত্রিশ শতক জমিতে আড়াই শতাধিক লেবু গাছের নতুন বাগান রয়েছে। স্বল্প ঝুঁকি ও সারা বছর নিরবচ্ছিন্ন আয়ের সুযোগ থাকায় সাধারণ ফসলের তুলনায় এই জাতের লেবু চাষ স্থানীয় কৃষকদের মাঝে নতুন আগ্রহ তৈরি করছে।
নিয়মিত পরিচর্যা ও সঠিক চারা নির্বাচনই দীর্ঘমেয়াদি ফলনের মূল ভিত্তি। লেবু চাষের প্রধান সুবিধা হলো বাজারে সারা বছরই এর চাহিদা ও প্রাপ্তি থাকে। মৌসুমে আকার ও চাহিদাভেদে প্রতিটি লেবু এক টাকা থেকে শুরু করে বারো টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। একই গাছে ফুল, কচি লেবু ও পরিপক্ব ফলের উপস্থিতি থাকায় চাষিকে কখনোই দীর্ঘ সময় আয়হীন থাকতে হয় না। এককালীন চাষের সবজি ফসলে আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজার ধসে যে আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কা থাকে, দীর্ঘমেয়াদি লেবুবাগানে সেই ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম।
বাগান তৈরির প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতি শতকে পাঁচটি থেকে ছয়টি গাছ রোপণ করা যায়। গাছ রোপণের সময় পরিমিত গর্ত করে মাটির সাথে পর্যাপ্ত জৈব সার এবং প্রতি গর্তে চার থেকে পাঁচ গ্রাম দানাদার কীটনাশক মিশিয়ে চারা স্থাপন করতে হয়। প্রাথমিক অবস্থায় দ্রুত বৃদ্ধির জন্য গাছের গোড়ায় নিয়মিত জৈব সার ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ডিএপি, ফসফেট ও পটাশ জাতীয় রাসায়নিক সার প্রয়োগ করা প্রয়োজন। চারা রোপণের প্রথম বছরে বৃদ্ধি সচল রাখতে মাসে দুই থেকে তিনবার মাকড়নাশক ও ছত্রাকনাশক স্প্রে করা জরুরি হলেও এক বছর পর থেকে মাসে একবার স্প্রে করাই যথেষ্ট হয়।
লেবু চাষের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দেয় মাকড়ের আক্রমণ এবং বর্ষাকালে পাতায় স্ক্যাব বা খসখসে লালচে দাগের প্রাদুর্ভাব। মাকড় নিয়ন্ত্রণে এবামেকটিন গ্রুপের অনুমোদিত কীটনাশক পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রস্তুতকারক কোম্পানির ওষুধ বদলে ব্যবহার করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভাঙা সহজ হয়। এছাড়া বর্ষাকালীন পাতায় ছত্রাকজনিত দাগ দূর করতে কপার হাইড্রোক্সাইড বা কপার অক্সিক্লোরাইড জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে কার্যকর ফল দেয়। গাছে ফুল ও ফলের ঘনত্ব বাড়াতে মাকড়নাশকের সঙ্গে উদ্ভিদ বৃদ্ধির নিয়ন্ত্রক উপাদান বা পিজিআর ব্যবহার করা হয়। নতুন বাগান সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে সারি থেকে সারির দূরত্ব বারো থেকে চৌদ্দ ফুট এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব দশ ফুট রাখা সবচেয়ে কার্যকর ও আদর্শ মান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে বাগানের ভেতর আলো-বাতাস চলাচলের পর্যাপ্ত পথ থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদে গাছগুলো পূর্ণাঙ্গ আকার ধারণ করতে পারে। চাষিদের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, ডাল থেকে তৈরি মানসম্মত গুটি কলমের চারা রোপণ করলে গাছে খুব দ্রুত ফুল ও ফল চলে আসে। শিকড়হীন দুর্বল চারা পরিহার করে সুস্থ মাতৃগাছের ফলন্ত ডাল থেকে গুটি কলম নির্বাচন করা হলে বাগানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত হয়।
অর্থনৈতিক দিক থেকে ত্রিশ শতক আয়তনের একটি জমিতে প্রথম বছরে চারা ক্রয়, রোপণ, সার, ওষুধ ও শ্রমিকের মজুরিসহ মোট পঁচিশ থেকে ত্রিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হতে পারে। প্রথম বছরেই উৎপাদিত ফল বিক্রির মাধ্যমে প্রাথমিক ব্যয়ের পুরো অর্থ উঠে এসে কিছু মুনাফা অর্জিত হয়। দ্বিতীয় বছর থেকে বড় ধরনের কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই কেবল নিয়মিত সার ও বালাইনাশকের সামান্য ব্যয়ে ধারাবাহিক উচ্চ মুনাফা ঘরে তোলা সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন