সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৯:৫২ পিএম
ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার তামাট গ্রামে লেবু চাষের মাধ্যমে ভাগ্যের অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটিয়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা জাহিদুল হাসান। একসময় চরম দারিদ্র্য আর অনটনের মধ্যে দিন কাটানো এক সাধারণ কৃষি শ্রমিক থেকে তিনি আজ প্রায় সত্তর বিঘা বিস্তৃত বহুমুখী কৃষি সাম্রাজ্যের মালিক। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে তিনি এখন পরিচিত `লেবু জাহিদ` নামে।
শূন্য থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও সংগ্রামের।
নিজের কোনো জমিজমা কিংবা পুঁজি ছিল না তাঁর। একবেলা আহার জুটলে অন্য বেলার খাবার অনিশ্চিত হয়ে পড়ত। জীবিকার তাগিদে শুরুতে মানুষের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কঠোর শ্রম দিতেন। পরবর্তীতে কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান ও সফল চাষিদের গল্প দেখে নিজের ভেতরেও উদ্যোগী হওয়ার তীব্র ইচ্ছা জাগে। সাহস আর শারীরিক পরিশ্রমকে মূল পুঁজি করে এক বিঘারও কম জমিতে লেবুর আবাদ শুরু করেন তিনি। অদম্য পরিশ্রমে কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁর আবাদি জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে পঁয়ষট্টি থেকে সত্তর বিঘায়। বর্তমানে ভালুকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে তাঁর এই বহুমুখী কৃষি প্রকল্প। এর মধ্যে চার বিঘা আয়তনের একটি বিশেষ নার্সারি রয়েছে, যা মূলত বিভিন্ন জাতের ফলের উন্নত চারা তৈরির কারখানা। সেখানে প্রায় একশত প্রকারের ফলের মাতৃগাছ সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব মাতৃগাছ থেকে কলম তৈরি করে তিনি দেশজুড়ে চারা বিক্রি করেন।
শুধু লেবুতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। চার বিঘার নার্সারিজুড়ে ফলদ গাছের পাশাপাশি সাথি ফসল হিসেবে আবাদ করা হয়েছে পেঁপে, মরিচ ও বেগুন। নার্সারির নালাগুলোতে চলছে বিভিন্ন দেশীয় মাছের চাষ। সেখানে প্রায় এক হাজার দুইশত পেঁপে গাছ রয়েছে। পাশাপাশি ফলন দিচ্ছে থোকায় থোকায় ধরা চায়না কমলা ও ভিয়েতনামী বারোমাসি মাল্টা। একই জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চাষ করা হচ্ছে ডুমুর জাতীয় তিন ফল, মিষ্টি কামরাঙা ও উন্নত জাতের আঙুর।
লেবুর বাণিজ্যিক আবাদই জাহিদের সফলতার মূল চালিকাশক্তি। তাঁর একটি একক বাগানেই এগারো বিঘা জমিতে প্রায় তিন হাজার লেবু গাছ রয়েছে। দুই বছর পূর্ণ হওয়ার পর থেকেই প্রতিটি গাছ পরিপূর্ণ ফলন দিতে শুরু করে। বাজার অনুকূলে থাকলে প্রতিটি গাছ থেকে বছরে গড়ে এক থেকে দেড় হাজার লেবু পাওয়া যায়। চলতি মৌসুমে বাজারে লেবুর ভালো দাম পাওয়ায় একেকটি লেবু পাইকারিতে বিশ টাকারও বেশি দরে বিক্রি হয়েছে। ফলে ফলন ও বর্তমান বাজারমূল্য মিলিয়ে এই বাগান থেকেই বছরে বিপুল পরিমাণ আয় নিশ্চিত হচ্ছে।
কৃষি থেকে উপার্জিত অর্থেই দুই কোটি টাকারও বেশি মূল্যের স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন তিনি। জমি কেনার পাশাপাশি গ্রামে নির্মাণ করেছেন নিজস্ব পাকা বাড়িঘর। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্যে আনন্দিত পরিবার ও আত্মীয়স্বজন। প্রাথমিক দিনগুলোতে তাঁর স্ত্রীও ফসলের পরিচর্যা ও শাকসবজি উত্তোলনে সরাসরি মাঠে নেমে পাশে থেকেছেন। নিজের সাফল্যের পাশাপাশি গ্রামীণ কর্মসংস্থান ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন তিনি। জাহিদ জানান, নার্সারি থেকে উন্নত জাতের কলম চারা সরবরাহ করে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় দশ হাজারেরও বেশি নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি করেছেন। বাগান তৈরির পর কীভাবে সার ও সেচ দিতে হবে সে বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ ও সার্বক্ষণিক দিকনির্দেশনা দেন তিনি।
তবে উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক বাজার উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন এই সফল চাষি। তিনি উল্লেখ করেন, দেশে একসঙ্গে সব চাষি ফসল আবাদ করলে হঠাৎ স্থানীয় বাজারে দরপতন ঘটে এবং কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। সরকার যদি বহির্বিশ্বে লেবু ও মাল্টাসহ স্থানীয় ফলমূল রপ্তানির সুযোগ তৈরি করে দেয়, তবে কৃষকরা নিশ্চিত লোকসান থেকে রক্ষা পাবেন এবং দেশ বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন