সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৯:০৩ পিএম
পেঁয়াজের বীজ উৎপাদন করে নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফরিদপুরের নারী উদ্যোক্তা সাহিদা বেগম। চরম আর্থিক অনটন আর স্বামীর বেকারত্বের মুখে দুই হাজার চার সালে মাত্র চল্লিশ শতক বর্গা জমিতে পেঁয়াজের বীজ চাষ শুরু করেছিলেন তিনি।
সেই উদ্যোগ এখন বিস্তৃত বাণিজ্যিক খামারে রূপ নিয়েছে। ফরিদপুর সদর উপজেলার অম্বিকাপুরে পঁচিশ একর জমি এবং ঠাকুরগাঁও ও দিনাজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে আরও চল্লিশ একর মিলিয়ে মোট পঁয়ষট্টি একর জমিতে তিনি পেঁয়াজের বীজের চাষ করছেন। শুরুতে পারিবারিক শ্রমে কার্যক্রম চালালেও বর্তমানে তাঁর খামারে বারো মাস শত শত শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে নারী শ্রমিকের সংখ্যাই বেশি, যারা মাঠের পরিচর্যা থেকে শুরু করে বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেজিংয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
শুরুর দিনগুলো ছিল সীমাহীন ত্যাগ ও সংগ্রামের। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে এসে তিনি পরিবারকে নিদারুণ অভাবের মধ্যে দেখতে পান। স্বামীর গৃহশিক্ষকতার সামান্য আয় আর বোরো ধান চাষ করে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। শ্বশুরের সামান্য জমিতে পেঁয়াজের বীজ করার অভিজ্ঞতা ও বাইরের পাইকারদের ভালো দাম দেওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করেন সাহিদা। এরপর দুই পাখি জমি বর্গা নিয়ে পেঁয়াজ লাগিয়ে প্রথম মৌসুমে দুই মণ বীজ পান। সেই বীজ আশি হাজার টাকায় বিক্রি করার পর কৃষিতে নিজের ভবিষ্যৎ খুঁজে পান তিনি। পরের বছর একই উদ্যোগে তেরো মণ বীজ উৎপাদিত হয়।
ধারাবাহিক সম্প্রসারণের একপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের সঙ্গে যুক্ত হন সাহিদা। কৃষি বিভাগের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক হিসেবে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তাঁকে আধুনিক বীজ উৎপাদন, মানরক্ষা এবং নিজস্ব লাইসেন্স নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে তিনি স্বত্বাধিকারী হিসেবে সরকারি অনুমোদন ও লাইসেন্স গ্রহণ করেন। স্বামীর নামানুসারে তাঁর উৎপাদিত পেঁয়াজ বীজের নাম দেওয়া হয় `খান বীজ`। স্থানীয় খোলা বাজারে নামহীনভাবে বিক্রির বদলে নিজস্ব মোড়কে বীজ বাজারজাত শুরু করায় তাঁর পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
পেঁয়াজ বীজ উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো সুস্থ ও রোগমুক্ত কন্দ বাছাই। জমিতে সরাসরি বীজতলা না করে বাছাইকৃত পেঁয়াজের কন্দ শোধন করে মাটিতে রোপণ করা হয়। পেঁয়াজ কন্দ লাগানোর জমি প্রস্তুত করতে ছয় থেকে সাতটি গভীর চাষ দিতে হয়। পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর দিয়ে জমি চাষের পর ভার্মিকম্পোস্ট বা কেঁচো সার, গোবর সার, খৈল, মুরগির লিটার এবং মাটি শোধনের জন্য চুন প্রয়োগ করা হয়। সার প্রয়োগের দুই থেকে তিন দিন আগে জমিতে চুন প্রয়োগ করলে ক্ষতিকর পোকা ও রোগজীবাণু বিনষ্ট হয়।
নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে জমিতে পেঁয়াজ রোপণ করা হয়। জমিতে হাত দিয়ে তৈরি সুনির্দিষ্ট লাইনে কন্দ বসানো হয়, যেখানে নির্দিষ্ট দূরত্ব মেনে একেকটি লাইনে তিন থেকে চারটি করে পেঁয়াজ পাতা হয়। রোপণের এক সপ্তাহের মধ্যে হালকা সেচ দেওয়া জরুরি। কোনোভাবেই জমিতে অতিরিক্ত ঢালাও সেচ দেওয়া যায় না, কারণ জমে থাকা পানিতে কন্দ পচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
মাঠে ফুল ও কদম আসার পর শুরু হয় নিবিড় পরিচর্যা। পেঁয়াজের ফুলে পরাগায়ন নিশ্চিত করতে জমিতে মৌমাছির কৃত্রিম বাক্স স্থাপন করা হয়। তবে মৌমাছির সক্রিয় উপস্থিতি কম থাকলে শ্রমিকদের মাধ্যমে প্রতিদিন আলতো হাতে ছুঁয়ে কৃত্রিম পরাগায়ন করানো হয়। এতে প্রতিটি ফুলের দানায় শতভাগ পরিপুষ্ট বীজ গঠিত হয়। পেঁয়াজের ডাটায় পার্পল ব্লচ রোগের সংক্রমণ বা লেদা পোকার আক্রমণ ঠেকাতে রোগ দেখা দেওয়ার আগেই নিয়মিত ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক স্প্রে করে মাঠ ধুয়ে ফেলা হয়।
ফসল পরিপক্ব হওয়ার শেষ সময়ে জমিতে কোনো সেচ দেওয়া নিষেধ।
এ সময় সেচ দিলে পেঁয়াজের কদম ভারী হয়ে মাটিতে হেলে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পেঁয়াজ বীজ চাষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সিডরের মতো শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে অতীতে তাঁর সম্পূর্ণ ফসল নষ্ট হয়েছিল এবং কোনো ঋণ না পেয়ে ধারদেনা করে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াতে হয়েছে তাঁকে। সাহিদা বেগমের খামারে তাহেরপুরী, কিং, সুখসাগর, বারি পেঁয়াজ এক এবং বারোমাসি গ্রীষ্মকালীন বারি পেঁয়াজ পাঁচ জাতের বীজ ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
ভেজাল রোধে এবং জাতের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে ফরিদপুর ও উত্তরাঞ্চলের আলাদা জেলায় ভিন্ন ভিন্ন জাতের জন্য পৃথক মাঠ নির্দিষ্ট রাখা হয়েছে। তাঁর উৎপাদিত বীজ সরাসরি বিএডিসি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রণোদনা কর্মসূচিতে নিয়মিত সরবরাহ করা হয়।
কৃষিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সরকারি-বেসরকারি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে সফল নারী কৃষক হিসেবে দশ হাজার টাকার নগদ পুরস্কার ও সনদ ছাড়াও চ্যানেল আই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এগ্রো অ্যাওয়ার্ডে পাঁচ লাখ টাকার পুরস্কার লাভ করেন তিনি। পরবর্তীতে তিনি সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে অনন্যা শীর্ষ দশ সম্মাননা এবং মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর থেকে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন