সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৯:১৭ পিএম
ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলায় অপ্রচলিত ফল আনারকলি চাষ করে গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন চমক সৃষ্টি করেছেন কৃষক স্টালিন। পর্যটন শহর কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে লবণ-মরিচ মেখে বিক্রি হওয়া এই ফলটিকে স্থানীয়ভাবে ট্যাং ফল এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্যাশন ফ্রুট নামে ডাকা হয়। মাত্র পাঁচটি চারা দিয়ে পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করে এখন আড়াই বিঘা জমিতে এর বাণিজ্যিক বাগান গড়ে তুলেছেন তিনি।
অল্প খরচে বিপুল আয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এই বাগান। একটি প্রাপ্তবয়স্ক গাছ থেকে প্রতি মৌসুমে এক থেকে দেড় হাজার পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। গাছগুলো একটানা আট থেকে দশ বছর পর্যন্ত ফলন দিয়ে থাকে। সব ধরনের পরিচর্যা ব্যয় বাদ দিয়ে বর্তমানে প্রতি বিঘা জমি থেকে বছরে বারো থেকে পনেরো লাখ টাকা নিট মুনাফা অর্জিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন উদ্যোক্তা।কক্সবাজারে বেড়াতে গিয়ে পর্যটকদের কাছে ফলটির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা দেখে এর আবাদ নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয় স্টালিনের। পেশায় অভিজ্ঞ চাষি হওয়ায় তিনি ড্রাগন, মাল্টা, কমলা, পেয়ারা ও টকমিষ্টি কুলের পাশাপাশি নতুন কিছু করার পরিকল্পনা করেন। এরপর যশোরের একটি বিদেশি নার্সারি থেকে পাঁচটি চারা সংগ্রহ করে জৈব সার প্রয়োগের মাধ্যমে রোপণ করেন। চারা লাগানোর মাত্র তিন মাসের মধ্যে গাছে ফুল আসে এবং দ্রুত ফলন ধরতে শুরু করে।
প্রাথমিক সাফল্য দেখে নিজের বাগানের ডাল কলম বা কাটিং করে চারা উৎপাদন শুরু করেন তিনি। বর্তমানে মহেশপুরের সাত কাঠা আয়তনের একটি পৃথক প্লটে পঞ্চাশটি গাছ রয়েছে। সেখানে প্রতিটি চারার মধ্যবর্তী দূরত্ব রাখা হয়েছে পাঁচ ফুট বাই পাঁচ ফুট, যা বাণিজ্যিকভাবে ফল চাষের জন্য সম্পূর্ণ আদর্শ। লতানো জাতীয় গাছ হওয়ায় বাঁশের চটি, জিবলির রলা, তার ও সুতা দিয়ে মাচা তৈরি করা হয়েছে। অবকাঠামোর ভারসাম্য ধরে রাখতে সিমেন্টের খুঁটির পাশাপাশি সাশ্রয়ী বাঁশ ও গাছের খুঁটি ব্যবহার করা হয়। এতে সাত থেকে আট কাঠা জমিতে মাচা ও জমি প্রস্তুত করতে মাত্র বারো থেকে পনেরো হাজার টাকা খরচ হয়। গাছে ফুল ফোটার পর থেকে মাত্র চল্লিশ দিনের মধ্যে ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ব হয়ে ওঠে। বাগান থেকে প্রতি বিশ দিন পর পর পর্যায়ক্রমে ফল তোলা যায়। ওজনের দিক থেকে প্রতি কেজিতে বারো থেকে তেরোটি ফল পাওয়া যায়। সে হিসাবে প্রতি মণে প্রায় ছয়শতটি ফল ধরে। পাইকারি বাজারে কেজিপ্রতি চারশত থেকে সাড়ে চারশত টাকা এবং পিস হিসেবে ত্রিশ থেকে চল্লিশ টাকায় বিক্রি হয়।
বাজারে আনারকলির চাহিদাও অত্যন্ত ব্যাপক। শুরুর দিকে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হলেও বর্তমানে চট্টগ্রামের পাইকাররা অগ্রিম বুকিং দিয়ে পুরো বাগানের ফল সংগ্রহ করে নিচ্ছেন। পর্যটন মৌসুমে বিশেষ করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে পর্যটকদের চাপ থাকায় পাইকারি বাজারে প্রতিটি ফলের দাম বেড়ে দাঁড়ায় সত্তুর থেকে আশি টাকা পর্যন্ত, যা সৈকতের খুচরা বিক্রেতারা একশত টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। সাধারণত মার্চ-এপ্রিল থেকে ফলন শুরু হয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত টানা সরবরাহ থাকে। প্যাশন ফ্রুটের প্রায় এগারোটি জাত থাকলেও বাংলাদেশের আবহাওয়ায় পার্পল বা লালচে রঙের জাতটি সবচেয়ে বেশি ফলনশীল। আনারকলি চাষে রোগবালাইয়ের কোনো ঝুঁকি নেই বললেই চলে। রাসায়নিক সার বা বিষাক্ত কীটনাশকের কোনো প্রয়োজন হয় না। কেবল শুকনা গোবর ও জৈব সার ব্যবহার করে এর পরিচর্যা করা হয়। মাঝে মাঝে মাছি পোকার উপদ্রব ঠেকাতে বাগানে সেক্স ফেরোমন ফাঁদ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
বেলে দোআঁশ মাটিতে এই ফলের আবাদ সবচেয়ে ভালো হয়। বাণিজ্যিকভাবে নতুন উদ্যোক্তারা এক বা দুই বিঘা জমিতে এই বাগান গড়ে তুলতে পারেন। প্রতি বিঘা জমিতে প্রথম বছর মাচা ও চারা তৈরিতে মোট ষাট থেকে সত্তুর হাজার টাকা বিনিয়োগ করলেই বছরে দশ থেকে বারো লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন