সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ০৮:৩৩ পিএম
কৃত্রিম জলাধার বা ডিশ তৈরি করে আধুনিক পদ্ধতিতে কুচিয়া চাষে সাফল্য পাচ্ছেন দেশের প্রান্তিক উদ্যোক্তারা। কম খরচে ও স্বল্প পরিশ্রমে গড়ে তোলা এই খামার থেকে জীবন্ত কুচিয়া উৎপাদন করে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ব্যাপক সুযোগ তৈরি হয়েছে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকং ও থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কুচিয়ার বিশাল রপ্তানি বাজার রয়েছে।
রপ্তানি আয়ে কুচিয়ার ভূমিকা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতীয় মৎস্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২ দশমিক ৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের কুচিয়া রপ্তানি হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ২৩ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে। ফলে চিংড়ি ও কাঁকড়ার মতো অপ্রচলিত জলজ প্রাণীর তালিকায় কুচিয়া এখন একটি অন্যতম সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্য।
মাঠপর্যায়ে এক বিঘার কিছু বেশি জমিতে কৃত্রিম ডিশ পদ্ধতিতে খামার তৈরি করে নিবিড় পরিচর্যা করা সম্ভব। কুচিয়া চাষের জন্য সাধারণ পুকুরের চেয়ে বিশেষ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করতে হয়। একেকটি ডিশ তৈরিতে জমি নির্বাচন করে দৈর্ঘ্য চব্বিশ ফুট, প্রস্থ বারো ফুট এবং গভীরতা তিন ফুট মাপে মাটি খনন করতে হয়। খনন শেষে তলদেশে প্রথমে পলিথিন বিছিয়ে তার ওপর জাল ও টেকসই ত্রিপল দেওয়া হয়। এরপর ত্রিপলের ওপর পুরু কাদামাটি দিয়ে পানির স্তর নিশ্চিত করা হয়। কুচিয়া মূলত কাদার ভেতরে বসবাস করতে পছন্দ করে। প্রতিটি ডিশ তৈরিতে আনুমানিক বিশ হাজার টাকা খরচ হয়।
ডিশের ওপর পর্যাপ্ত পরিমাণে কচুরিপানা ছড়িয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। কুচিয়া সরাসরি তীব্র রোদ সহ্য করতে পারে না এবং ছায়াযুক্ত শীতল স্থান পছন্দ করে। প্রজনন বা ব্রিডিংয়ের সময়েও কচুরিপানা অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হিসেবে কাজ করে। আবাসস্থল হিসেবে ডিশের ভেতরে প্লাস্টিকের পিভিসি পাইপও স্থাপন করা হয়, যেখানে মাছগুলো দলবদ্ধভাবে আশ্রয় নেয়।খামারে প্রাথমিকভাবে প্রায় একশত পঁচাত্তর কেজি পোনা ছেড়ে কার্যক্রম শুরু করা যায়। কুচিয়া অত্যন্ত শক্ত প্রকৃতির জলজ প্রাণী হওয়ায় পানি ও কাদার বাইরে কিংবা শুকনা মাটিতেও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। পরিবহন ও বাজারজাতকরণের সময় দশ থেকে পনেরো দিন কোনো খাবার না খেয়েও এটি টিকে থাকে।
খাদ্য ব্যবস্থাপনায় কুচিয়ার জন্য কোনো কৃত্রিম বা তৈরি ফিড প্রয়োজন হয় না। এটি কেবল জীবন্ত খাদ্য বা লাইভ ফিড গ্রহণ করে। ডিশের ভেতরে ছোট তেলাপিয়া মাছের পোনা, শামুক বা গুগলি এবং কেঁচো দিয়ে প্রাকৃতিক খাবারের চাহিদা মেটানো হয়। ফলে প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরির পর নিয়মিত মাসিক খাদ্য বাবদ চাষিদের কোনো অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয় না।
সাধারণত ছয় মাস লালন-পালনের পর কুচিয়া বাজারজাতকরণের উপযোগী হয়। মাঝারি আকারের কুচিয়ার বাজারে চাহিদা বেশি থাকে এবং প্রতি কেজি প্রায় সাড়ে তিনশত টাকা দরে বিক্রি হয়। আকার যত বাড়ে, কেজিপ্রতি দর কিছুটা পরিবর্তিত হয়। খামারের ডিশগুলোর চারপাশে থাকা ফাঁকা পাড়ে রেড লেডি জাতের পেঁপেসহ বিভিন্ন শাকসবজি চাষ করে অতিরিক্ত আয় নিশ্চিত করা যায়।
স্বল্প খরচে টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কুচিয়া চাষ গ্রামীণ তরুণদের কর্মসংস্থানে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন