সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬, ১১:০০ এএম
নওগাঁয় আউশ ধানের ভালো ফলন হলেও বাজারে ন্যায্য দাম না পেয়ে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষীরা। জেলার হাটগুলোতে নতুন ধান উঠলেও চালকল মালিক কিংবা বড় ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি না থাকায় প্রতি মণ ধান ৬৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকরা। গত বছরের তুলনায় মণে অন্তত ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা কম মেলায় বিঘাপ্রতি চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।
লাভের বদলে লোকসান হওয়ায় অনেকে ধান চাষ বন্ধ করার কথা ভাবছেন। চাষীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, সার, কীটনাশক প্রয়োগ, সেচ ও কাটা-মাড়াই মিলিয়ে প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৫০০ থেকে ১২ হাজার টাকা। নওগাঁ-মহাদেবপুর আঞ্চলিক সড়কসহ বিভিন্ন এলাকার মাঠে ধান কাটার উৎসবমুখর পরিবেশ থাকলেও বিক্রির সময় কৃষকদের সেই স্বস্তি মিলিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় হাটগুলোতে পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকার সুযোগ নিচ্ছেন ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা।
মহাদেবপুর উপজেলার উত্তরগ্রামের কৃষক মোহাম্মদ কুদ্দুস জানান, চার বিঘা জমিতে ব্রিধান-৫৬ ও ব্রিধান-৬৫ জাতের আউশ আবাদে ৪৫ হাজার টাকা ব্যয়ের পর ৬৪ মণ ফলন মিলেছে। বর্তমান বাজারে ৭০০ টাকা মণ দরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচই উঠছে না, যার প্রভাবে পরবর্তী আমন চাষের প্রস্তুতি ব্যাহত হচ্ছে। একই গ্রামের চাষী মইন উদ্দিন বলেন, আট বিঘা জমিতে আবাদ করে সার ও ফসফেটের খরচ উঠছে না। প্রতি মণে অন্তত এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ টাকা দাম প্রত্যাশিত ছিল।
স্বরস্বতীপুর হাটে আসা সঞ্চয় সরকার নামের এক চাষী জানান, ১০ বিঘা জমিতে ব্রিধান-১৯ জাতের ধানের আবাদে এক লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয়ের বিপরীতে ১৫০ মণ ধান বিক্রি করে মিলেছে এক লাখ ১২ হাজার ৫০০ টাকা। বাজারে বড় মিলার না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি সাড়ে ৭০০ টাকা দরে ধান ছেড়ে দেন।
বোরো মৌসুমে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি গুদামে ধান কেনার কারণে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকলেও আউশে সরকারি ক্রয় না থাকায় সিন্ডিকেট প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।
হাটের ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান চৌধুরী ট্রেডার্সের শামসুর রহমান জানান, বড় চালকল মালিকরা ধান না কেনায় তারা পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। ঝুঁকি এড়াতে তারা কম দামে ধান কিনছেন।
নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর রহমান জানান, চলতি বছর জেলায় ৫৮ হাজার ৫৭৩ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে, যা থেকে এক লাখ ৮৪ হাজার ৫০৪ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। কৃষকদের বিগত সময়ের চেয়ে ভালো ফলন হলেও বাজারমূল্যের সুরক্ষায় ধান ভালোভাবে শুকিয়ে সংরক্ষণের পর বিক্রির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, উৎপাদন বাড়াতে কৃষি বিভাগের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালিত হলেও বাজারের ন্যায্যমূল্য ও মনিটরিং তদারকি করবে প্রশাসন ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
নওগাঁ জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সোহাগ সরকার জানান, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ধানের দাম নির্ধারণ করে বেঁধে দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আউশ মৌসুমে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ চালু করা হলে কৃষকরা ন্যায্য দাম পেতে পারেন এবং বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সমন্বিত পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন