সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
গত মৌসুমের ভালো মুনাফার অনুপ্রেরণায় চলতি মৌসুমে দিনাজপুরে পাটের ব্যাপক আবাদ হলেও ফসল ঘরে তোলার শেষ মুহূর্তে এসে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা। একদিকে পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও গভীর জলাশয়ের অভাবে পাট জাগ দেওয়ার পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বাজারে বিক্রির সময় মিলছে না উৎপাদন খরচের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কাঙ্ক্ষিত দাম। বর্তমানে স্থানীয় হাটগুলোতে প্রতি মণ পাট বিক্রি হচ্ছে প্রায় চার হাজার টাকা দরে, যেখানে সার ও শ্রমিকের বাড়তি ব্যয়ের কারণে উৎপাদন খরচ তুলতেই প্রতি মণে অন্তত ছয় থেকে আট হাজার টাকা প্রাপ্তির দাবি করছেন কৃষকরা।
দুই সংকটের মুখে পড়ে জেলার পাট চাষিদের লাভের হিসাব অনেকটাই এলোমেলো হয়ে গেছে। দিনাজপুর সদর উপজেলার মাধবপুর এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত গভীর পানির অভাবে কৃষকরা বাধ্য হয়ে ফসলি জমির পাশের ছোট ডোবা, এমনকি সড়কের কালভার্টের নিচে জমে থাকা সামান্য পানির মধ্যে পাট জাগ দিচ্ছেন। প্রখর রোদের মধ্যেই সেখানে কাজ করছেন নারী ও পুরুষ শ্রমিকরা, যাদের কেউ জাগ দেওয়া পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন, আবার কেউ তা কাদাযুক্ত পানিতে ধুয়ে শুকানোর ব্যবস্থা করছেন।
তিন বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করা মাধবপুরের এক কৃষক জানান, পানি না থাকায় কালভার্টের নিচে পচানো পাটের আঁশ শুকিয়ে বাজারে নিয়ে চার হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করতে হচ্ছে, অথচ প্রতি মণে অন্তত ছয় হাজার টাকা না পেলে উৎপাদন খরচ মেটানো সম্ভব নয়। একই রকমের সংকটময় চিত্র দেখা গেছে জেলার বিরল ও খানসামা উপজেলার বিভিন্ন ফসলি মাঠেও। গত বছর সীমিত জমিতে চাষ করে লাভবান হওয়ায় এবার ধারদেনা করে চার বিঘা জমিতে পাট বুনেছিলেন আরেক চাষি, কিন্তু বীজ, সার, কীটনাশক ও দিনমজুরের অস্বাভাবিক মজুরি বৃদ্ধির কারণে এবার সামগ্রিক উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে।
কৃষকরা অভিযোগ করছেন যে কৃষি উপকরণের দাম যেভাবে কয়েক গুণ বেড়েছে, সেই তুলনায় উৎপাদিত পাটের বাজারমূল্য বাড়েনি। অল্প পানিতে পাট জাগ দেওয়ার ফলে পাটের আঁশের প্রাকৃতিক উজ্জ্বলতা ও মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যার কারণে ব্যবসায়ীরাও সিন্ডিকেট করে কম দাম দিচ্ছেন বলে চাষিদের অভিযোগ। মাঠপর্যায়ের কৃষকদের এই উদ্বেগের বিপরীতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দিনাজপুরের উপ-পরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান যে চলতি বছর জেলায় পাটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল চার হাজার ৫৫ হেক্টর জমি। এর বিপরীতে আবাদ অর্জিত হয়েছে চার হাজার ১৭২ হেক্টর জমিতে, অর্থাৎ সরকারি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ১১৭ হেক্টর বেশি জমিতে পাটের ফলন হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন যে কৃষকদের সময়মতো সরকারি প্রণোদনা দেওয়া হয়েছিল এবং মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টির সুবিধা পাওয়ায় চাষ ভালো হয়েছে, তাই শেষ পর্যন্ত কৃষকরা বাজারে সন্তোষজনক দাম পাবেন বলেই প্রত্যাশা করছে কৃষি বিভাগ। উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের এই বিশাল ব্যবধান দূর করতে সরকারি উদ্যোগে পাটের সহায়ক মূল্য নির্ধারণ এবং পাট পচানোর জন্য টেকসই জলাধার সংরক্ষণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন