সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ০৪:১৭ পিএম
প্রবাস জীবনের অনিশ্চয়তা আর করপোরেট পেশায় বেতন বকেয়া পড়ার গভীর হতাশা কাটিয়ে ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল পালনে আত্মনির্ভরশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তরুণ উদ্যোক্তা লিমন। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে একটি বাচ্চা ও একটি ছাগল কেনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া তার এই উদ্যোগ আজ একটি প্রতিষ্ঠিত প্রাতিষ্ঠানিক খামারে রূপ নিয়েছে। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর না করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইনে সরাসরি ভোক্তাদের কাছে নিজস্ব খামারের গবাদিপশু বিক্রি করে তিনি গ্রামীণ অর্থনীতিতে সৃষ্টি করেছেন নতুন সম্ভাবনা।
দৃঢ় মনোবল আর সঠিক পরিকল্পনাই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে। অতীত জীবনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিমন জানান, অতীতে ১৭ মাস প্রবাসে থাকার পর কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তিনি দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে গ্রাফিক্স ডিজাইনার হিসেবে একটি সফটওয়্যার সংস্থায় সাড়ে তিন বছর চাকরি করলেও আড়াই লাখ টাকা বকেয়া পড়ে। শেষ পর্যন্ত এক লাখ চার হাজার টাকার চেক প্রতারণার বিরুদ্ধে চার বছর আইনি লড়াই চালিয়ে আদালতের রায় পেলেও কোনো অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই গভীর সংকটকালে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়ে তিনি গ্রামে ফিরে দেশীয় সম্পদের ওপর ভরসা করে "লাভীবা গোট ফার্ম" গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন।
শুরুর দিকে স্থানীয় অভিজ্ঞদের অনুকরণ না করে নিজেই কাঠ ও আধুনিক নকশা ব্যবহার করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি স্বাস্থ্যসম্মত উঁচু মাচা শেড তৈরি করেন তিনি। ছাগল ও ভেড়া একসাথে লালন-পালন করা যায় না—এমন সামাজিক ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে চারটি বাচ্চা সহ একটি দেশি মা ভেড়া দিয়ে তিনি সমন্বিত পালনের কাজ শুরু করেন। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উদ্যোগে সাভারে তিন দিনের প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সরকারি সহায়তায় উন্নত জাতের পাঠা ও আধুনিক শেড সুবিধা পান তিনি। বর্তমানে তার খামারে ৬০টির বেশি উন্নত ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল ও বিলুপ্তপ্রায় দেশি জাতের ভেড়া রয়েছে।
খামার ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হয় রোগ প্রতিরোধ ও পুষ্টি ব্যবস্থাপনার ওপর। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের নির্দেশনা মেনে বছরে একবার ভাইরাসজনিত পিপিআর রোগের বাধ্যতামূলক প্রতিষেধক প্রয়োগ এবং কৃমিনাশক ও নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে পশুদের সুস্থ রাখা হয়। খাদ্যের জন্য নিজস্ব জমির তাজা ঘাসের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় উৎপাদন ব্যয় নেমে এসেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সাধারণ হাট-বাজারে বিক্রির অনিশ্চয়তা এড়িয়ে তিনি ইন্টারনেটভিত্তিক নিজস্ব বিক্রিব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন, যেখানে বাচ্চা ছাগল সাত থেকে সাড়ে আট হাজার এবং পূর্ণবয়স্ক খাসি ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
নিজের খামারের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৩০ থেকে ৪০ জন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করতে ভূমিকা রেখেছেন লিমন। নতুনদের উদ্দেশে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণ ছাড়া কখনোই হাট থেকে বেশি দামে পশু না কিনে দেশীয় ব্ল্যাক বেঙ্গল জাত দিয়ে ছোট পরিসরে খামার শুরু করা উচিত।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন