সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬, ১২:০০ পিএম
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার বাহরা গ্রামটি এখন চারদিকে `নারী কৃষকের গ্রাম` হিসেবেই সমধিক পরিচিত। এই গ্রামের নারীরা কেবল সংসারের কাজই সামলাচ্ছেন না, বরং সরাসরি মাঠে নেমে কৃষিকাজ ও পশুপালনের মাধ্যমে নীরব অর্থনৈতিক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। এমনকি স্বামী প্রবাসে থাকলে কিংবা পরিবারের কেউ এসআই অথবা ওসির মতো সরকারি কর্মকর্তা হলেও এই গ্রামের নারীরা কৃষিকাজ থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন না। চিন্তার এই অভাবনীয় পরিবর্তন পুরো গ্রামের আর্থসামাজিক চিত্র পাল্টে দিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে নারীরা এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন। এমনই একজন সফল নারী কৃষক তাঁর দীর্ঘ পথচলার গল্প জানিয়েছেন, যিনি ২০১৪ সালের দিকে তাঁর ছেলেরা বিদেশে পাড়ি জমানোর পর পুরো খামারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। শুরুটা হয়েছিল একটি ছোট্ট ঘটনা থেকে, যখন একদিন মাঠে গিয়ে তিনি দেখেন তাঁর স্বামীর লাগানো লাউ ও মিষ্টি কুমড়ার গাছ অযত্নে পড়ে আছে। সেই দৃশ্য দেখে তাঁর ভেতরে থাকা অনাবাদি জমি কাজে লাগানোর জেদ চাপে এবং তিনি নিজে কৃষিকাজ শুরু করেন।
পরবর্তীতে জাতীয় নির্বাচনের সময় এক কৃষি কর্মকর্তা তাঁদের বাড়িতে কিছুদিন অবস্থান করার সুবাদে তাঁর কৃষিজমিগুলো ঘুরে দেখেন। ওই কর্মকর্তার উৎসাহ ও উদ্দীপনায় তিনি কৃষিকাজে আরও গভীরভাবে যুক্ত হন, আর এখন তাঁর এই উদ্যোগে গ্রামের পুরুষরাও ব্যাপকভাবে উৎসাহিত হচ্ছেন। গ্রামের মানুষ আধুনিক কৃষিতে তাঁর এই ঈর্ষণীয় সাফল্য দেখে তাঁকে এখন `আধুনিক কৃষক` হিসেবে সম্বোধন করেন।
কৃষিকাজ ও গরুর খামার থেকে প্রাপ্ত লাভের টাকা দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে কিনেছেন পাওয়ার টিলার, ধান মাড়াইয়ের মেশিন, ভুট্টা মাড়াইয়ের মেশিন এবং একটি নিজস্ব রাইস মিল। তাঁর খামারে এখন নিয়মিত আট থেকে দশজন নারী শ্রমিক কাজ করেন, যারা চারা তৈরি ও ধান কাটা থেকে শুরু করে খেতের যাবতীয় কাজ নিজেরাই সম্পন্ন করেন।
বর্তমানে তিনি দেড় বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আগাম বাঁধাকপি ও ফুলকপির চাষ করছেন। আবহাওয়ার প্রতিকূলতা থেকে চারা বাঁচাতে তিনি নিজস্ব পদ্ধতিতে পলিথিন ও বাঁশের মাচা দিয়ে বিশেষ আচ্ছাদন তৈরি করেছেন। মাটি আগাছামুক্ত করে চার থেকে পাঁচ দিন ঢেকে রাখার পর যত্নসহকারে বীজ বপন করা হয়। তিনি আশা করছেন আগামী পনেরো থেকে বিশ দিনের মধ্যেই তাঁর উৎপাদিত এই আগাম কপি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে পারবেন। ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাঠের লাঙ্গল দিয়ে করা কৃষিকাজ দেখে বড় হওয়া এই উদ্যমী নারী এখন আধুনিক যন্ত্রপাতির সাহায্যে পুরো গ্রামের কৃষিচিত্রই বদলে দিয়েছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন