সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২৬, ০৯:৪১ পিএম
মাছের পুকুরে দেশীয় ঝিনুক কাজে লাগিয়ে মুক্তা চাষের এক সফল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন যশোরের তরুণ উদ্যোক্তা আব্দুর রহমান। জেলার অভয়নগর উপজেলার ইক্তারপুর গ্রামের এই খামারি মাত্র তিনটি পুকুর ব্যবহার করে মুক্তা উৎপাদন এবং নিজস্ব জুয়েলারি অলংকার তৈরি করছেন। এই সমন্বিত উদ্যোগ থেকে বছরে তার আয় দাঁড়াচ্ছে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা।
পুকুরে কার্পজাতীয় মাছের সাথে একই খরচে ঝিনুক বেড়ে উঠছে।
করোনা মহামারির সময় এলাকাভিত্তিক পুকুরগুলোতে অযত্নে পড়ে থাকা ঝিনুক হাঁস-মুরগিকে খাইয়ে নষ্ট করতে দেখে প্রথম এই উদ্যোগের কথা ভাবেন আব্দুর রহমান। পরবর্তীতে তিনি দেশের কয়েকটি সফল খামার সরেজমিন ঘুরে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে মুক্তা চাষের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তার পুকুরগুলোতে সিলভার কার্প ও কাতলা মাছের সাথে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন বা প্রাকৃতিক জলজ খাদ্য রয়েছে। মাছের জন্য দেওয়া সাধারণ খাবারের মাধ্যমেই ঝিনুকের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হওয়ায় মুক্তা চাষে কোনো বাড়তি খাদ্য খরচের প্রয়োজন হয় না।
মুক্তা চাষের জন্য স্থানীয় জলাশয় থেকে সংগৃহীত মাঝারি আকৃতির এক থেকে দুই বছর বয়সী ঝিনুক সবচেয়ে উপযোগী। ছোট ঝিনুকে অপারেশনের পর মৃত্যুর হার বেশি থাকে এবং আড়াই থেকে তিন বছরের বেশি বয়সী ঝিনুকে মুক্তা উৎপাদনের হার লক্ষণীয়ভাবে কমে যায়। সংগৃহীত এসব ঝিনুককে বিশেষ প্লাস্টিক নেটের ব্যাগে ঢুকিয়ে বোতলের তৈরি ভাসমান ফ্লুটের মাধ্যমে পানির নির্দিষ্ট স্তরে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ঝিনুকগুলো সরাসরি পুকুরের কাদায় ছেড়ে দিলে হারিয়ে যাওয়া ও মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়, কিন্তু ঝুলন্ত অবস্থায় রাখলে সহজেই এদের সংখ্যা ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ করা যায়।
খামারে দুই ধরনের প্রক্রিয়ায় মুক্তা উৎপাদন করা হয়, যার মধ্যে ডিজাইন বা ইমেজ মুক্তা অন্যতম। এ পদ্ধতিতে স্প্যাচুলা ও ওপেনার যন্ত্রের সাহায্যে ঝিনুকের মুখ সামান্য ফাঁক করে ম্যান্টল পর্দার নিচে একটি পকেট তৈরি করে ঝিনুকের খোলস দিয়ে তৈরি ক্যালসিয়াম কার্বোনেটের বিশেষ নকশার ডাইস ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। ডাইস বসানোর পর ভেতরের বাতাস বের করে একটি ঝিনুকের দুই পাশে দুটি নকশা স্থাপন করা সম্ভব। বাইরের এই বস্তুর ব্যথায় ঝিনুকের শরীর থেকে ক্রমাগত নেকার নামের বিশেষ তরল নিঃসৃত হয়, যা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ডাইসের ওপর প্রলেপ ফেলে ১১ থেকে ১২ মাসের মধ্যে উজ্জ্বল মুক্তায় পরিণত হয়।
গোল মুক্তার ক্ষেত্রে কোনো কৃত্রিম ডাইস ব্যবহারের বদলে সরাসরি জীবিত ঝিনুকের মাংস বা ম্যান্টল টিস্যু ব্যবহার করা হয়। একটি সুস্থ ঝিনুক কেটে তার ম্যান্টল পর্দার প্রান্তভাগ থেকে ছোট ছোট টুকরো সংগ্রহ করে তা দিয়ে চার থেকে পাঁচটি ঝিনুকে অস্ত্রোপচার চালানো যায়। একটি ঝিনুকের মাংসের মধ্যভাগে সূক্ষ্মভাবে চারটির মতো টিস্যু ঢুকিয়ে দেওয়া হয় এবং মুক্তা পরিপক্ব হতে প্রায় তিন বছর সময় লাগে। এ প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত মুক্তা সংগ্রহের পর ঝিনুকটি মারা যায় না, ফলে একই ঝিনুক থেকে আবারও মুক্তা আহরণ করা সম্ভব হয়।
অস্ত্রোপচারের পর ঝিনুকের সংক্রমণ ঠেকাতে বিশেষ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়।
অস্ত্রোপচার করা ঝিনুকগুলোকে প্রথমে চব্বিশ ঘণ্টা অ্যান্টিবায়োটিক ও ব্যথানাশক ওষুধের দ্রবণে ডুবিয়ে রেখে এরপর পুকুরের জলে স্থানান্তর করা হয়। পরিণত হওয়ার পর বিশেষ কাটিং মেশিনের সাহায্যে খোলসের বাড়তি অংশ কেটে মুক্তা আলাদা করে আড়ং ও কক্সবাজারের পর্যটন বাজারের উপযোগী বিভিন্ন অলংকার তৈরি করা হয়। খাঁটি মুক্তা শনাক্তকরণের উপায় হিসেবে আব্দুর রহমান জানান, আসল মুক্তা কোনো শক্ত তলে ঘষলে দাগ পড়লেও হাত দিয়ে মুছে দিলে তা পরিষ্কার হয়ে যায়, কিন্তু প্লাস্টিকের নকল মুক্তার দাগ কখনো মোছা যায় না।
ব্যয় ও আয়ের দিক থেকে এই ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ঝিনুক, নেট ব্যাগ, ফ্লুট ও নকশার ডাইস মিলিয়ে একটি ঝিনুকে মোট উৎপাদন খরচ হয় প্রায় ৪০ টাকা। পাইকারি বাজারে একটি ঝিনুক থেকে প্রাপ্ত দুটি নকশার মুক্তা প্রায় ২০০ টাকায় বিক্রি হয়, যা থেকে ১ হাজার ঝিনুক চাষে সরাসরি ২ লাখ টাকা আয় সম্ভব। আবার এসব মুক্তা প্রক্রিয়াজাত করে অলংকারে রূপান্তর করলে প্রতিটি মুক্তার মূল্য দাঁড়ায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা এবং একেকটি মুক্তার মালা বিক্রি হয় প্রায় ৫ হাজার টাকায়। তবে ইউটিউব দেখে হুজুগে না নেমে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ও সঠিক কারিগরি জ্ঞান নিয়েই এই খাতে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দেন এই সফল খামারি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন