অক্টোবর ৩১, ২০২৬, ১১:২৮ পিএম
কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবনে বিনার বৈপ্লবিক কার্যক্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।
পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ও সুনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) এ পর্যন্ত ২২টি বিভিন্ন ফসলের মোট ১৩৯টি উন্নত ও উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এই বৃহৎ অর্জনের মধ্যে ৯৬টি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে সরাসরি প্ল্যান্ট মিউটেশন ব্রিডিং বা পরমাণু বিকিরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে। এর মধ্যে গামা রশ্মি, এক্স-রশ্মি কিংবা আধুনিক আয়ন বিম প্রয়োগ করে উদ্ভিদের জিনগত রূপান্তরের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়।
পারমাণবিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিকূলতা-সহনশীল ও উচ্চফলনশীল ফসলের নতুন জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বর্তমানে পুরো বিশ্বের মধ্যে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অবস্থিত এই জাতীয় কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি শুধু ফসলের জাত উদ্ভাবনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ১০টি বিশেষায়িত জীবাণুসার এবং মাঠপর্যায়ে ৫৭টি আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট গবেষকরা।
প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অগ্রগতি তুলে ধরে বিনার ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক শরীফুল হক ভুঁইয়া জানান, পরমাণু শক্তির সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে তারা কৃষিতে টেকসই পরিবর্তন এনেছেন। ২২টি ফসলের ১৩৯টি উচ্চফলনশীল জাতের মধ্যে ৯৬টিই সরাসরি বিকিরণ গবেষণার ফসল। এসব প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ পর্যন্ত ৩১টি মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছে। এর মধ্যে ২০১৯ সালের স্বাধীনতা পদকসহ জাতীয়ভাবে ২২টি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা থেকে ৯টি সম্মাননা রয়েছে।
বিনার গবেষকদের অন্যতম বড় উদ্ভাবন হলো স্বল্পমেয়াদি ও উচ্চফলনশীল বিনাধান-১৪। প্রচলিত পদ্ধতিতে ধানের একটি নতুন জাত তৈরি করতে ৮ থেকে ১২ বছর সময়ের প্রয়োজন হলেও আধুনিক আয়ন বিম প্রযুক্তির সাহায্যে গবেষকরা মাত্র ৪ বছরে এই জাতটি কৃষকের জন্য প্রস্তুত করেন।
উপকূলের লবণাক্ত মাটি এবং দেশের বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের কথা মাথায় রেখে বিনাধান-১০ এবং বিনাধান-২৩-এর মতো বিশেষ সহনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব উদ্ভাবনী জাতের বদৌলতে দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ অনাবাদি ও পতিত জমি চাষাবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া খরা, অতিবৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও রোগবালাই প্রতিরোধী নতুন বৈশিষ্ট্যের খোঁজে দেশীয় ফসলের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন করেছে সংস্থাটি।
রাসায়নিক ইউরিয়া সারের বিকল্প হিসেবে ডাল ও শিম জাতীয় তেলের ফসলে ব্যবহারের জন্য উদ্ভাবিত ১০টি জীবাণুসার অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে ইনস্টিটিউট থেকে ছোলা, মসুর, চিনাবাদাম, সয়াবিন, মুগ, মাষকলাই, বরবটি ও ধৈঞ্চার জন্য উন্নত জীবাণুসার উৎপাদন ও মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা হচ্ছে। এই সার ব্যবহারের ফলে সয়াবিনে ৭৫ থেকে ১৫০ শতাংশ এবং অন্যান্য ডাল ফসলে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পায়। এতে অতিরিক্ত ইউরিয়ার প্রয়োজন হয় না, যা কৃষকের আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি জমির দীর্ঘমেয়াদি উর্বরতা বজায় রাখে। এর সঙ্গে ফসফো-ভার্মিকম্পোস্ট প্রয়োগে রাসায়নিক ফসফেটের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্য হারে কমে এসেছে।
উদ্ভাবিত ১৩৯টি জাতের মধ্যে ধানের মোট ২৬টি জাত রয়েছে। যার ভেতর আউশের ২টি, আমনের ১৪টি এবং বোরো মৌসুমের ১০টি জাত। তেলের ফসলে রয়েছে মোট ৩৭টি জাত, যার মধ্যে সরিষার ১২টি, চিনাবাদামের ১২টি, সয়াবিনের ৭টি এবং তিলের ৬টি জাত। ডাল জাতীয় ফসলে মোট ৪১টি জাতের ভেতর মুগের ১৩টি, মসুরের ১২টি, ছোলার ১১টি, মাষকলাইয়ের ৩টি এবং খেসারির ২টি জাত অন্যতম। এছাড়া উদ্যানতাত্ত্বিক ফসলে রয়েছে ২৫টি জাত, যার ভেতর টমেটোর ১৩টি, লেবুর ৩টি, পেঁয়াজের ২টি, মরিচের ২টি এবং হলুদ, রসুন, কুল, সফেদা ও কালিজিরার একটি করে জাত অন্তর্ভুক্ত। পাশাপাশি আঁশ ও পাটের ৪টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে সংস্থাটি।
কৃষি গবেষণার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি মাটিতে পুষ্টি ও ফসফেট ব্যবস্থাপনা, লবণাক্ত মাটিতে গম ও সূর্যমুখী চাষ, ভূগর্ভস্থ আর্সেনিক সমস্যা নিরসনে অগভীর নলকূপ ও উদ্ভিদে আর্সেনিক স্থানান্তর রোধ, টমেটোর ঢলে পড়া রোগ দমন এবং মাল্টা ও সফেদার বিশেষ কলম তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে।
গবেষণায় অসামান্য অবদানের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৯-৮০, ১৯৮০-৮১ ও ১৯৮১-৮২ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কারে ভূষিত হয়। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানটির বায়োটেকনোলজি বিভাগ ২০১৩ সালে জাতীয় কৃষি পুরস্কারের রৌপ্য পদক এবং ২০১৪ সালে ইনস্টিটিউট স্বর্ণ পদক পায়। এরপর ২০১৬ সালে জাতীয় পরিবেশ পদক এবং ২০১৯ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পদক লাভ করে বিনা।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তায় অবদানের জন্য ২০১৪ সালে সাবেক মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) থেকে আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পান। ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পুরস্কার অর্জন করে। ২০১৮ সালে জলমগ্নতা সহনশীল ধানের জন্য আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট সম্মাননা জানায়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে ড. শামছুন্নাহার বেগম জাতিসংঘের ওমেন ইন প্ল্যান্ট ব্রিডিং পুরস্কার লাভ করেন এবং একই বছর প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিনা পুনরায় জাতিসংঘের আউটস্ট্যান্ডিং অ্যাচিভমেন্ট স্বীকৃতি পায়।
বিনার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহবুবুর রহমান খান উল্লেখ করেন, পারমাণবিক কৌশল ও বায়োটেকনোলজির সুষম ব্যবহারের মাধ্যমেই প্রতিকূল আবহাওয়া সহনশীল জাত উদ্ভাবন করে খাদ্য নিরাপত্তায় বিশ্বের শীর্ষ আটটি প্রতিষ্ঠানের একটিতে পরিণত হয়েছে এই প্রতিষ্ঠান।
তথ্যসূত্র: বাসস

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন