বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬,

সার আমদানিনির্ভরতা কমাতে বন্ধ ৩ কারখানা নভেম্বরেই চালুর উদ্যোগ

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম

সার আমদানিনির্ভরতা কমাতে বন্ধ ৩ কারখানা নভেম্বরেই চালুর উদ্যোগ

দেশে সারের উৎপাদন বাড়িয়ে আমদানিনির্ভরতা কমাতে বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় তিনটি কারখানা আগামী নভেম্বরের মধ্যেই চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। একই সাথে বিদ্যমান কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নতুন প্ল্যান্ট স্থাপনের মাধ্যমে আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক মোট সার উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)।

উদ্যোগগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সার আমদানির বিশাল আর্থিক চাপ কমবে, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং অভ্যন্তরীণ কৃষি মৌসুমে কৃষকদের চাহিদা অনুযায়ী সারের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি প্রধান সার কারখানার মধ্যে বর্তমানে চারটি চালু রয়েছে। গ্যাস সরবরাহের মারাত্মক সংকট ও কাঁচামালের ঘাটতিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে চট্টগ্রামের টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড এবং ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের। অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন ও নির্ধারিত চাপে গ্যাস না পাওয়ায় বন্ধ রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড। কারখানা তিনটিকে আবারও সচল করতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও কাঁচামাল সংগ্রহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মেরামতকাজ সম্পন্ন করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

বিসিআইসির চেয়ারম্যান মো. বাবুল মিঞা জানান, আশুগঞ্জ সার কারখানায় পুনরায় উৎপাদন শুরু করার প্রধান পূর্বশর্ত হলো নির্ধারিত চাপে নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক গ্যাস নিশ্চিত করা। অন্যদিকে চট্টগ্রামের টিএসপি ও ডিএপি কারখানায় উৎপাদন চালাতে প্রয়োজন ফসফরিক অ্যাসিডসহ অন্যান্য মৌলিক কাঁচামাল। গ্যাস ও কাঁচামালের সরবরাহ নিশ্চিত হলে নভেম্বরের মধ্যেই কারখানাগুলো পুনরায় উৎপাদনে ফিরবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

দেশের সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে সারের অবিচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য হলেও ইউরিয়া, টিএসপি এবং ডিএপি সারের অভ্যন্তরীণ চাহিদার পুরোটা রাষ্ট্রীয় উৎপাদনে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিবছর সরকারি কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে সার আমদানি করতে হয়।

সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাষ্ট্রীয় সার কারখানাগুলোয় ১১ লাখ ৭৩২ দশমিক ৫০ মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদিত হয়েছে। এছাড়া ৬৮ হাজার ২৫৯ মেট্রিক টন টিএসপি এবং ৮২ হাজার ১৪২ মেট্রিক টন ডিএপি সার তৈরি হয়।

ওই অর্থবছরে দেশে ইউরিয়া সারের মোট চাহিদা ছিল ২৬ লাখ মেট্রিক টন। সে হিসাবে নিজস্ব কারখানা থেকে জাতীয় ইউরিয়া চাহিদার প্রায় ৪২ দশমিক ৩৪ শতাংশ মেটানো সম্ভব হয়। তবে ফসফেটজাত সারের ক্ষেত্রে দেশীয় যোগান ছিল একেবারেই নগণ্য; চাহিদার বিপরীতে টিএসপি মাত্র ৯ দশমিক ১০ শতাংশ এবং ডিএপি উৎপাদিত হয় মাত্র ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ।

পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট হয় যে আমদানি কমাতে বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সারের স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। বিসিআইসি চেয়ারম্যান জানান, সারের বিপুল ঘাটতি পূরণ করতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬ দশমিক ৪৪ লাখ মেট্রিক টন এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ দশমিক ৭৯ লাখ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বিদেশ থেকে আনতে হয়েছে। বন্ধ থাকা রাষ্ট্রীয় সব কারখানা পুরোদমে উৎপাদনে ফিরিয়ে ইউরিয়া সার আমদানির ব্যয় থেকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।

আশুগঞ্জ সার কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতিবাচক আশ্বাস দিয়েছে। অন্যদিকে টিএসপি কমপ্লেক্সের সালফিউরিক অ্যাসিড প্ল্যান্ট মেরামতের কাজ চলছে এবং ফসফরিক অ্যাসিড সংগ্রহের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। পর্যাপ্ত কাঁচামাল পৌঁছালে ডিএপি কারখানাও উৎপাদনে যুক্ত হবে।

ইউরিয়া সার উৎপাদনের মূল উপাদান হলো প্রাকৃতিক গ্যাস, যার পর্যাপ্ত চাপ না থাকলে কারখানা চালানো অসম্ভব। একইভাবে টিএসপি ও ডিএপি উৎপাদনের মূল ভিত্তি হলো ফসফরিক অ্যাসিড ও অন্যান্য রাসায়নিক। এ কারণে বিসিআইসি নিয়মিতভাবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা, গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড এবং স্থানীয় গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যৌথ সমন্বয় রক্ষা করছে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় শুধু বন্ধ ইউনিটগুলো খোলাই নয়, আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বার্ষিক উৎপাদন ২৭ লাখ মেট্রিক টনে নিয়ে যাওয়ার ছক আঁকা হয়েছে। এজন্য পুরোনো যন্ত্রপাতি আধুনিকায়ন ও নতুন ইউরিয়া ও টিএসপি প্ল্যান্ট নির্মাণের সম্ভাব্যতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সাথে চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনাধীন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে সারের অস্থির মূল্যবৃদ্ধি ও বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের মুখে স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি দেশের খাদ্য সুরক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। রাষ্ট্রীয় কারখানার উৎপাদন বাড়লে প্রান্তিক কৃষকের হাতে সময়মতো ন্যায্যমূল্যে সার পৌঁছানো সহজ হবে।