অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ইনানীতে গভীর নলকূপ খনন করতে গিয়ে ভূগর্ভ থেকে অনবরত নির্গত গ্যাসে সৃষ্ট ভয়াবহ আগুন প্রায় ৩০ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও নেভানো সম্ভব হয়নি। বুধবার সকাল থেকে আগুনের মূল কারণ ও গ্যাসের প্রকৃতি নিরূপণে ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) বিশেষজ্ঞ দল।
অগ্নিকাণ্ডের তীব্রতা ও দুর্ঘটনা এড়াতে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং জানমালের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে ঘটনাস্থলের চারপাশের ২০০ মিটার এলাকা সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে বিচ্ছিন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এর আগে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার দিকে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট খাল সেতু সংলগ্ন এলাকায় এই বিপত্তি ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ বসানোর জন্য শ্রমিকরা মাটি খোঁড়ার কাজ করছিলেন। খননকালে হঠাৎ ভূগর্ভ থেকে তীব্র গন্ধযুক্ত গ্যাস প্রচণ্ড বেগে নির্গত হতে থাকে এবং মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়।
অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে মঙ্গলবার রাতেই সরেজমিনে পরিদর্শনে যান বাপেক্সের ভূবিজ্ঞান বিভাগের ব্যবস্থাপক ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি জানান, নলকূপটি বসানোর সময় প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন শ্রমিকরা। ভূগর্ভস্থ ফাটল বা প্রাকৃতিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে উচ্চচাপের গ্যাস পৃষ্ঠে উঠে আসার পথ তৈরি করে নিয়েছে।
তিনি বলেন, গ্যাসের স্তর উন্মুক্ত হওয়ার পর মাটির নিচে উচ্চচাপ সৃষ্টি হয় এবং কয়েক দিনের মধ্যে তা চারপাশের নানা ফাটল দিয়ে ওপরে উঠে আসে। বাতাসের সংস্পর্শে আসার পর মানবসৃষ্ট কোনো কর্মকাণ্ড বা বৈদ্যুতিক কোনো ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ থেকেই এই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে।
আগুনের জ্বলন্ত শিখার রঙ ও বের হওয়া ধোঁয়ার প্রকৃতি দেখে প্রাথমিক ধারণায় গ্যাসে ভারী হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতি থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে সংগ্রহ করা নমুনা রাসায়নিক পরীক্ষাগারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের আগে এই গ্যাসের প্রকৃতি ও প্রকৃত উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব। এই মুহূর্তে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের সঠিক মজুত সম্পর্কেও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়ে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বাপেক্সের দলপ্রধান বলেন, গ্যাসের তীব্র প্রবাহ জোর করে বন্ধ করার চেষ্টা করলে বা চাপ আটকে দিলে মাটির নিচে অন্য কোনো দুর্বল স্থান ফেটে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে আশপাশের এলাকায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা বাড়বে। ফলে আপাতত সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বজায় রেখে সাধারণ মানুষকে নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে রাখার কৌশল নেওয়া হয়েছে।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, তথ্য পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণের সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। কিন্তু মাটির নিচ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হতে থাকায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়নি। সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সসহ সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংস্থাগুলোকে অবহিত করা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, স্থানীয় জননিরাপত্তা রক্ষায় মাইকিং করে বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হচ্ছে। বাপেক্সের কারিগরি দলের পরামর্শ মোতাবেক প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং অগ্নিকাণ্ডস্থলের ২০০ মিটার পরিধি সম্পূর্ণ খালি করে অবরুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি সামাল দিতে জরুরি প্রয়োজনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।
উখিয়া পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানিয়েছে, তীব্র আগুনের উত্তাপ ও ধোঁয়া প্রধান বৈদ্যুতিক তারে ছড়িয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় ঠেকাতে মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ৩৩ হাজার ভোল্টের উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন