বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬,
হিমালয় সীমান্ত সংঘাত

ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ২৮, ২০২৬, ০২:০৩ পিএম

ভারত-চীন সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা

ছবি: সংগৃহীত

ভারত ও চীনের মধ্যকার বিতর্কিত হিমালয় সীমান্তে আবারও চরম সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য অরুণাচল প্রদেশের সীমান্ত এলাকায় দুই দেশের সশস্ত্র সেনারা বর্তমানে সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। হিমালয় সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত ভারতের বিশেষ আধা-সামরিক বাহিনী ইন্দো-তিব্বত বর্ডার পুলিশের (আইটিবিপি) প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর সম্প্রতি এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ছয় বছর পার হলেও সীমান্তে এই টানটান পরিস্থিতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তা সুরক্ষার কঠোর ভাবমূর্তিকে নতুন করে তীব্র রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কূটনৈতিক স্তরে সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত স্পষ্ট হচ্ছিল। গত মাসে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভারত সফর এবং নরেন্দ্র মোদির সাথে আনুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটি আবহ তৈরি হয়েছিল। এর সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধের প্রেক্ষাপটও বেইজিং ও নয়াদিল্লিকে অর্থনৈতিক স্বার্থে পারস্পরিক বিরোধ কমিয়ে কাছাকাছি আসতে উৎসাহিত করছিল। তবে প্রত্যন্ত দুর্গম সীমান্তে সেনাদের এই নতুন মুখোমুখি অবস্থান দুই দেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক আলোচনা ও অগ্রগতিকে চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

অরুণাচল প্রদেশের দূরবর্তী আপার সুবানসিরি এলাকায় চীনা বাহিনীর অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি উঠেছে। একই সাথে ভারতীয় বাহিনীর নিয়মিত সীমান্ত টহলে চীনা সেনারা সরাসরি বাধা সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ কংগ্রেসের নেতা বসিরাম সিরাম দাবি করেছেন, চীনা সেনারা ভারতীয় সীমানার প্রায় ৫০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে অবস্থান নিয়েছে। তিনি জানান, কৌশলগত পাহাড়ের চূড়ায় চীনা সেনাদের শক্ত অবস্থান দৃশ্যমান, আর তাদের বিপরীতে তুলনামূলক নিচু এলাকায় দাঁড়িয়ে আছেন ভারতীয় জওয়ানরা। তবে এই অনুপ্রবেশের সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

দুই দেশের মধ্যকার সীমান্ত বিরোধটি দীর্ঘদিনের এবং এর মূল শিকড় প্রোথিত রয়েছে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্ধারিত ঐতিহাসিক ‘ম্যাকমোহন লাইন’-এর মধ্যে। ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ ভারত এবং তৎকালীন স্বাধীন তিব্বত যৌথভাবে ‘সিমলা কনভেনশন’ স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে এই সীমান্তরেখা নির্ধারণ করেছিল। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ভারত সরকার এই ম্যাকমোহন লাইনকেই চীনের সঙ্গে তাদের আইনগত আন্তর্জাতিক সীমানা হিসেবে মেনে আসছে। তবে ১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে বেইজিং এই সীমান্ত চুক্তির বৈধতা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। চীনের আনুষ্ঠানিক যুক্তি হলো, তিব্বতের এককভাবে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে সীমান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো সার্বভৌম আইনগত অধিকার ছিল না।

বর্তমানে চীন অরুণাচল প্রদেশের পুরো ভূখণ্ডকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করে এবং অঞ্চলটিকে ‘দক্ষিণ তিব্বত’ বা ‘জাংনান’ নামে চিহ্নিত করে। এছাড়া কাশ্মীর বিরোধের সাথে যুক্ত বিতর্কিত আকসাই চীন অঞ্চলটিও বর্তমানে চীনের সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার ওপর ভারত ও পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই নিজস্ব সার্বভৌম মালিকানা দাবি করে।

১৯৯৩ সালে দুই দেশ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) বরাবর শান্তি ও স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে ঐতিহাসিক চুক্তি সই করলেও আজ পর্যন্ত সীমান্তের সঠিক অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য নিরসন করা সম্ভব হয়নি। ২০২০ সালের জুন মাসে পূর্ব লাদাখের বরফাবৃত গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সেনাদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। ওই ঘটনায় অন্তত ২০ জন ভারতীয় সেনা সদস্য নিহত হন। পরবর্তীতে চীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে যে তাদের চারজন সেনা ওই সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন।

গালওয়ান উপত্যকার সেই ভয়াবহ সংঘাতের পর ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয় এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো পুরো সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে মোদি সরকারের প্রকাশ্য স্বচ্ছতা দাবি করে। ওই সময় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, চীনা বাহিনী লাদাখের ভারতীয় অংশে একতরফাভাবে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের অপচেষ্টা চালিয়েছিল এবং তাদের পূর্বপরিকল্পিত আগ্রাসী পদক্ষেপের কারণেই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূত্রপাত হয়। তবে সেই আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাত্র দুই দিন পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জাতির উদ্দেশে দাবি করেন, ভারতের ভূখণ্ডে বিদেশি কেউ প্রবেশ করেনি কিংবা কোনো ভারতীয় সীমান্তচৌকি বেদখল হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যের এই প্রকাশ্য বৈপরীত্য নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিলেও আজ পর্যন্ত নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি।

এদিকে চীনা বাহিনীর সামরিক সক্ষমতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আইটিবিপি প্রধান শত্রুজিৎ কাপুর। তিনি উল্লেখ করেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার ওপারে চীনের সীমান্তবর্তী সামরিক পরিকাঠামো ও সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এর ফলে পাহাড়ি ভূখণ্ডে প্রচলিত যুদ্ধের পদ্ধতিতে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে তাদের মোকাবিলা করা ভারতীয় বাহিনীর জন্য কৌশলগতভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই জটিল বাস্তবতা মাথায় রেখে লাদাখের মতো আকস্মিক চরম পরিস্থিতি দ্রুত সামাল দিতে সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যদের আধুনিক বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ ডনথির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের আলোচনার সমান্তরালে সীমান্তে এই ধরনের সামরিক মহড়া চালানো মূলত প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চীনা দীর্ঘমেয়াদী কৌশল। তাঁর মতে, পাহাড়ি সীমান্তে কোনো নিশ্চিত সীমারেখা না থাকায় এ ধরনের বিপজ্জনক অচলাবস্থা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয় এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে তা যেকোনো মুহূর্তে মাঠপর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন যে, চীনা বাহিনী অতীতে প্রতিষ্ঠিত যৌথ টহলব্যবস্থা থেকে একতরফাভাবে সরে এলে সীমান্ত পরিস্থিতি অনির্ধারিতভাবে অস্থিতিশীল রূপ ধারণ করে। তবে অরুণাচলের আপার সুবানসিরি এলাকায় চলমান মুখোমুখি অবস্থানের বিষয়ে তিনি কোনো সরাসরি জবাব দেননি।

সীমান্ত সংকট কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে সামরিক কমান্ডার ও কূটনৈতিক পর্যায়ে দফায় দফায় নিয়মিত বৈঠক চলছে। চলতি বছরের ৬ আগস্ট সীমান্তসংক্রান্ত পরামর্শ ও সমন্বয় ব্যবস্থার (ডব্লিউএমসিসি) ৩৬তম যৌথ বৈঠক সম্পন্ন হয়। এরপর সেপ্টেম্বর মাসে অরুণাচল সীমান্তেই প্রথমবারের মতো উচ্চপর্যায়ের সামরিক কমান্ডার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এসব কূটনৈতিক ও সামরিক সংলাপ সীমান্তে স্থায়ী স্থিতিশীলতা আনতে চরমভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক বি আর দীপক বিশ্লেষণ করে জানিয়েছেন, অরুণাচলে নতুন করে সেনা অনুপ্রবেশের অভিযোগ ক্ষমতাসীন মোদি সরকারের সামরিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত জবাবদিহিকে ফের মারাত্মক প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। তাঁর মতে, সীমান্ত পর্যায়ের স্থানীয় বৈঠকগুলো হয়তো তাৎক্ষণিক উত্তেজনা সাময়িক প্রশমিত করতে পারে, কিন্তু এটি কয়েক দশকের পুরনো ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত বিরোধের টেকসই সমাধান কখনোই নিশ্চিত করতে পারে না।

দুই দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি সমঝোতা ও সমন্বিত সুস্পষ্ট পদক্ষেপ ছাড়া হিমালয়ের বুকে শান্তি বজায় রাখার যেকোনো উদ্যোগ ভঙ্গুরই থেকে যাবে বলে মত প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা। বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যেও অরুণাচল ও লাদাখের অমীমাংসিত সীমান্তবিরোধ শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় সামরিক ও ভূকৌশলগত মাথাব্যথা হিসেবে থেকে যাচ্ছে।