অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৪:১৪ পিএম
তেজপাতা চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিজেদের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছেন রংপুরের কৃষকেরা। একসময় কেবল বসতবাড়ির আঙিনা কিংবা ফসলি জমির আইলে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে লাগানো এই মসলা গাছ এখন বাণিজ্যিক ফসলে রূপ নিয়েছে। কম পরিচর্যা এবং অল্প ব্যয়ে নিশ্চিত লাভের সুযোগ থাকায় ধানসহ অন্যান্য প্রচলিত ফসলের বদলে কৃষকেরা এখন বাণিজ্যিকভাবে তেজপাতার বাগান গড়ে তুলছেন।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপা মধুপুর ইউনিয়নের সাদরা, রাজিব, বিনোদ মাঝি ও বুড়িরহাটসহ বিভিন্ন গ্রাম এখন পরিচিতি পেয়েছে তেজপাতার গ্রাম হিসেবে। এসব এলাকায় রাস্তার দুই ধার, বাড়ির উঠান কিংবা ফসলি মাঠের পাশে এখন মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য তেজপাতা গাছ। কাউনিয়ার সাফল্য দেখে পার্শ্ববর্তী পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলাতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই মসলা চাষ।
পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারদর ভালো পাওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে। অন্যান্য ফসলে সার ও কীটনাশকের পেছনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ হলেও তেজপাতা বাগানে পরিশ্রম ও পরিচর্যার খরচ অত্যন্ত কম।
স্থানীয় চাষিরা জানান, ধান বা অন্য ফসলে অধিক খাটুনি দিয়েও অনেক সময় উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। অথচ দেড় একর জমির তেজপাতা বাগান থেকে এক মৌসুমেই তিন লাখ টাকার বেশি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। রোগবালাইয়ের ঝুঁকি কম থাকায় একবার গাছ রোপণ করলে দীর্ঘ মেয়াদে ফলন ও মুনাফা পাওয়া যায়।
উৎপাদিত তেজপাতা বিক্রির জন্য স্থানীয় কৃষকদের বাড়তি কোনো ভোগান্তি পোহাতে হয় না। দেশের শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকটি খাদ্যপণ্য ও ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি মাঠপর্যায় থেকে এসব পাতা সংগ্রহ করছে। ইউনানি গ্রুপ, স্কয়ার গ্রুপ, প্রাণ, পুষ্টি ও তীরসহ বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান সরাসরি চাষিদের কাছ থেকে নিয়মিত পাতা কিনছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সৌদি আরব ও দুবাইসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এই অঞ্চলের তেজপাতা রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে একশ হেক্টরেরও বেশি জমিতে তেজপাতার আবাদ হচ্ছে। এই খাত থেকে প্রতিবছর কৃষকদের সম্মিলিত আয় দাঁড়াচ্ছে পাঁচ কোটি টাকার বেশি।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এক হেক্টর জমিতে তেজপাতা আবাদের জন্য এক হাজার একশ থেকে এক হাজার দুইশটি চারার প্রয়োজন পড়ে। হেক্টরপ্রতি প্রাথমিক উৎপাদন খরচ হয় এক লাখ পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। বিপরীতে এক হেক্টর বাগান থেকে প্রায় ১৭ টন কাঁচা পাতা উৎপাদিত হয়, যা শুকানোর পর দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে চার টনে। এই পরিমাণ শুকনা পাতা বিক্রি করে কৃষকের মোট আয় আসে তিন লাখ ২০ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। ফলে সব খরচ বাদ দিয়ে চাষিদের হেক্টরপ্রতি নিট মুনাফা থাকে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকার কাছাকাছি।
রংপুর অঞ্চলের বেলে-দোআঁশ ও দোআঁশ মাটি তেজপাতা চাষের জন্য প্রাকৃতিকভাবেই বিশেষ উপযোগী। ফলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় এই মসলা আবাদ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত করার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন