অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম
দেশের ভেতরেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ, দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং রোগীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে রাজধানীর শহীদ আবু সাইদ আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে দুই দিনব্যাপী কোলোরেক্টাল সার্জারি সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান।
বিদেশে চিকিৎসার প্রবণতা কমাতে হবে।
রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন, উন্নত চিকিৎসার সন্ধানে বাংলাদেশের বহু রোগীকে প্রতিবছর বাধ্য হয়ে দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে। বিশেষায়িত চিকিৎসার সীমাবদ্ধতা, আধুনিক সরঞ্জামের অভাব ও ক্লিনিক্যাল দক্ষতার পাশাপাশি সামগ্রিক সেবার মান এবং আস্থার ঘাটতি এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ফলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে চলে যাচ্ছে। এই নির্ভরশীলতা কমাতে হলে দেশের মাটিতেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা, প্রযুক্তির সন্নিবেশ এবং সহমর্মিতাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
চিকিৎসাসেবাকে কেবল একটি পেশা হিসেবে না দেখে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও আশার সঙ্গে যুক্ত এক মহান দায়িত্ব হিসেবে বর্ণনা করেন রাষ্ট্রপতি।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, রোগীর সঙ্গে মানবিক আচরণ প্রদর্শন, চিকিৎসাসংক্রান্ত জটিল বিষয়গুলো সহজ ও বোধগম্য ভাষায় রোগী ও স্বজনদের বুঝিয়ে বলা, পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি আন্তরিক সহমর্মিতা থাকা অপরিহার্য। আর্থিক সংকটের কারণে যেন কোনো নাগরিক প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, সে লক্ষ্যে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বিগত ১৭ বছরের স্বাস্থ্য খাতের সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা, ব্যাপক অনিয়ম, সীমাহীন দুর্নীতি ও সমন্বয়হীন অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের খেসারত দিতে হয়েছে স্বাস্থ্য খাতকে। অবকাঠামো ও দক্ষ টেকনিশিয়ান নিশ্চিত না করেই কোটি কোটি টাকার ভারী যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, যা প্যাকেটবন্দি অবস্থায় নষ্ট হয়েছে। চিকিৎসক, নার্স ও টেকনিশিয়ান নিয়োগে দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে সরকারি হাসপাতালের প্রাথমিক সেবা ও ওষুধ থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছিল।
অতীতের এই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাস্তবমুখী পরিকল্পনা, জবাবদিহিতা ও বরাদ্দের স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। এ সময় তিনি স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গৃহীত বিভিন্ন ঐতিহাসিক পদক্ষেপ স্মরণ করেন।
বর্তমান সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি জানান, স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে রেকর্ড ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এই বরাদ্দের প্রতিটি টাকার স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সরকার পর্যায়ক্রমে দেশের ১০০ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। পাশাপাশি উপজেলা পর্যায়ে সেবার আওতা বাড়াতে নতুন চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ এবং ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান নিয়োগের ব্যাপক প্রক্রিয়া চলছে।
দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ কোলোরেক্টাল রোগে আক্রান্ত হলেও সামাজিক লজ্জা ও অসচেতনতার কারণে সময়মতো চিকিৎসকের কাছে আসেন না বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপতি। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসাসুবিধা সহজলভ্য করার ওপর তিনি তাগিদ দেন। অনুষ্ঠানে উত্থাপিত একটি জাতীয় কোলোরেক্টাল সার্জারি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার দাবির বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন তিনি।
আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে দেশি-বিদেশি খ্যাতিমান সার্জনদের অভিজ্ঞতা দেশের তরুণ চিকিৎসকদের দক্ষতা বাড়াতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানের শুরুতে বাংলাদেশ সোসাইটি অব কোলন অ্যান্ড রেক্টাল সার্জন্সের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদুল ইসলামের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য দেন উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. সাহাদত হোসেন শেখ।
সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এফ এম সিদ্দিকী, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশীদ, বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ান্স অ্যান্ড সার্জন্সের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম আজিজুল হক এবং ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল।
দুই দিনের এই আন্তর্জাতিক আসরে দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা তরুণ চিকিৎসকদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেবেন এবং জটিল কেস নিয়ে মতবিনিময় করবেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন