অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৩:১০ পিএম
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের নওগাঁ জেলার বদলগাছী উপজেলায় অবস্থিত সোমপুর মহাবিহার প্রাচীন এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ও স্থাপত্যের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে টিকে রয়েছে। একসময় জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু শিক্ষার্থী ও গবেষক এই প্রাঙ্গণে ছুটে আসতেন।
অষ্টম শতাব্দীর শেষভাগে পাল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শাসক ধর্মপাল এই সুবিশাল বৌদ্ধ মহাবিহার নির্মাণ করেন। সে সময় পাল সাম্রাজ্য ছিল সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী বৌদ্ধ সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম।
প্রায় ২৭ একর বা ১১ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই ঐতিহাসিক কমপ্লেক্সের চারপাশ ঘিরে রয়েছে সুবিন্যস্ত ১৭৭টি ভিক্ষুকক্ষ। এসব কক্ষে ভিক্ষু ও সন্ন্যাসীরা বসবাস করতেন এবং নিয়মিত অধ্যয়ন ও ধর্মীয় ধ্যানচর্চা পরিচালনা করতেন। সম্পূর্ণ স্থাপত্য পরিকল্পনাটি একটি নিখুঁত চতুষ্কোণ আকৃতিতে বিন্যস্ত, যার ঠিক কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি বিশাল মূল মন্দির।
এই মহাবিহারের মূল নকশায় কেবল ভারতীয় স্থাপত্যরীতিই অনুসরণ করা হয়নি। এতে গুপ্ত, পাল এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় স্থাপত্যশৈলীর এক অপূর্ব সমন্বয় পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে বিহারের চারপাশের দেয়ালে এখনও টিকে রয়েছে এক হাজারের বেশি পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক। সেখানে প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রা, নানা ধরনের প্রাণী, পৌরাণিক উপাখ্যান এবং দৈনন্দিন সমাজের জীবন্ত চিত্র নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, সোমপুর মহাবিহারের এই চতুষ্কোণ ও সোপানযুক্ত কেন্দ্রীয় মন্দির পরিকল্পনা পরবর্তীতে সমগ্র এশিয়ার বৌদ্ধ স্থাপত্যে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার বিখ্যাত বরবুদুর মন্দির, মিয়ানমার, নেপাল ও কম্বোডিয়ার বিভিন্ন প্রাচীন বৌদ্ধ স্থাপত্যের রূপরেখায় এই পাহাড়পুর মহাবিহারের পরিকল্পনার সুস্পষ্ট সাদৃশ্য লক্ষণীয়।
দ্বাদশ শতাব্দীর পর রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল, বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব ক্রমান্বয়ে সংকুচিত হওয়ার কারণে মহাবিহারটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত রূপ নেয়।
পরিত্যক্ত হওয়ার পর কয়েক শতাব্দী ধরে মাটির নিচে চাপা পড়ে ছিল এই প্রাচীন কীর্তি। পরবর্তীতে উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকরা খননকাজ পরিচালনা করে মহাবিহারটিকে পুনঃআবিষ্কার করেন।
স্থাপত্যিক ও ঐতিহাসিক অনন্যতার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৮৫ সালে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো পাহাড়পুরের এই সোমপুর মহাবিহারকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। এটি প্রমাণ করে যে প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ড বিশ্ব জ্ঞান, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং স্থাপত্যবিদ্যার এক প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন