অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার দাবিতে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের ডাক দেওয়া হয়েছে।
সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন যৌথভাবে এই কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। তিন দফা দাবি পূরণ না হওয়ার অভিযোগ তুলে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল থেকে সাজেক সংযোগ সড়কে এই অবরোধ কার্যকর করা হবে। একই সাথে বর্তমানে সেখানে অবস্থানরত পর্যটকদের আজ বুধবারের মধ্যেই নিরাপদে পর্যটন এলাকা ত্যাগ করার বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছে সংগঠন দুটি।
বুধবার বিকেল চারটার দিকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির অফিশিয়াল যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত এক যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
যৌথ বিবৃতিতে সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নতুন জয় চাকমা ও সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বাবুধন চাকমা উল্লেখ করেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাঘাইহাট ও মাচলং বাজার দুর্গাপূজা উদযাপন কমিটির আন্তরিক অনুরোধে এবং ধর্মীয় উৎসবের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানিয়ে গত ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর পর্যন্ত পূর্বঘোষিত কর্মসূচি সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের ন্যায্য দাবি আদায় না হওয়ায় ২২ অক্টোবর থেকে পুনরায় অনির্দিষ্টকালের জন্য রাজপথে নামতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই অবরোধ বলবৎ থাকবে।
এর আগে গত ১১ অক্টোবর সকাল থেকে সাজেক সড়কে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করেছিল স্থানীয় এই দুই সংগঠন।
ওই দিন বিকেলে স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের উত্থাপিত দাবি পূরণের আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দেওয়া হলে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কোনো কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় ৪৮ ঘণ্টা পর ১৫ অক্টোবর ফের সাজেক পর্যটন সড়কে অবরোধ নামায় তারা। পরবর্তীতে দুর্গাপূজার কারণে কর্মসূচি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সংগঠন দুটির সর্বশেষ বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়, জনসংহতি সমিতির (জেএসএস সন্তু গ্রুপ) সশস্ত্র সদস্যরা এখনো সাজেকের পুরোনো অবস্থানগুলোতে প্রকাশ্যে অবস্থান করছে।
তাদের দাবি অনুযায়ী, সশস্ত্র গ্রুপের কোম্পানি কমান্ডার চিনু মারমা ও সাইমন চাকমার নেতৃত্বে সাজেকের মাচলং এলাকার থালকুম্ভো, চিল্ল্যাতুলি কুটির, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভুয়োছড়িতে প্রকাশ্য সশস্ত্র তৎপরতা চালানো হচ্ছে। বিবৃতিতে আরও অভিযোগ আনা হয়, এসব সশস্ত্র ব্যক্তিরা শতাধিক নিরীহ গ্রামবাসীকে প্রাণনাশের হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন করে বাড়িছাড়া করেছে এবং সাধারণ মানুষের মুঠোফোন কেড়ে নিয়েছে। এই ভীতিকর পরিস্থিতির কারণে স্থানীয় জুমচাষিরা পাহাড়ে গিয়ে হলুদ ও ঝাড়ুফুলের বাগান পরিষ্কার বা পরিচর্যার স্বাভাবিক কাজে যেতে সাহস পাচ্ছেন না।
গ্রামবাসীর জানমাল রক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সশস্ত্র ব্যক্তিদের এলাকা থেকে বিতাড়িত না করা পর্যন্ত এই অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে আন্দোলনকারীরা।
পাহাড়ে এর আগের অবরোধের সময়ও সাধারণ বাসিন্দা ও পর্যটকদের চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়েছিল।
খাগড়াছড়ির দীঘিনালার জোড়াব্রীজ থেকে সাজেক ভ্যালি পর্যন্ত বিস্তৃত সড়কে সব ধরনের যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ায় পণ্য পরিবহন ও স্থানীয়দের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে। সাপ্তাহিক হাটের দিনগুলোতেও স্থানীয় বাজারে কেনাবেচা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় জুমের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বিক্রি করতে না পেরে চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন পাহাড়ি কৃষকেরা। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, নতুন করে শুরু হতে যাওয়া এই অবরোধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
সড়কে গাছ ফেলে ও ব্যারিকেড দিয়ে যানবাহন চলাচল আটকে দেওয়ায় এর আগে সাজেক ইউনিয়নের লুসাই, ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীসহ প্রায় ৩০ হাজার স্থানীয় বাসিন্দা মারাত্মক দুর্ভোগে পড়েছিলেন বলে পুলিশ নিশ্চিত করেছিল।
গত অবরোধ চলাকালে সাজেকে কয়েক দিন ধরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া বিপুলসংখ্যক পর্যটককে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় একটি গাড়িবহর নামানো হয়েছিল। কিন্তু উজো বাজার এলাকায় পৌঁছালে আন্দোলনকারীরা সেই গাড়িবহরও আটকে দেয়। পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে দীর্ঘ আলোচনার পর পর্যটকবাহী গাড়িগুলোকে নিরাপদে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সেই অনাকাঙ্ক্ষিত অচলাবস্থার কারণে রাঙামাটি জেলা প্রশাসন একপর্যায়ে পর্যটকদের সাজেক ভ্রমণের ওপর আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে বাধ্য হয়।
পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ায় গত ১৫ অক্টোবর সেই ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিয়েছিল জেলা প্রশাসন। কিন্তু নতুন করে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক আসায় সাজেকের আন্তঃযোগাযোগ ও প্রাণবন্ত পর্যটন খাত আবারও গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়ল।
তবে সাধারণ মানুষের মৌলিক মানবিক প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে বেশ কিছু জরুরি সেবাকে এই কর্মসূচির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবরোধ চলাকালে জরুরি ফায়ার সার্ভিস, অ্যাম্বুলেন্স, মরদেহ বহনকারী গাড়ি, জরুরি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ সরবরাহকারী যানবাহন, সংবাদপত্র বহনকারী গাড়ি এবং দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের বহনকারী যানবাহন অবাধে চলাচল করতে পারবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন