বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬,

সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরির টিকে থাকার লড়াই

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০৬:৩১ পিএম

সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরির টিকে থাকার লড়াই

সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ঝাওয়াল ইউনিয়নের চাঁদপুর গ্রামে শত শত বছর ধরে টিকে রয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি তৈরির শিল্প। বাপ-দাদার এই আদি পেশা ধরে রেখে জীবিকা নির্বাহ করছেন গ্রামের কয়েকশো নারী-পুরুষ।

ভোরের আলো ফোটার আগেই বেত কাটার জন্য জলাশয়ে নামেন পুরুষ কারিগররা। ডোবার পানি পচে আলকাতরার মতো ঘন ও কালো হয়ে থাকে। সেই দুর্গন্ধযুক্ত হাঁটু কিংবা কোমর পানিতে শরীর ডুবিয়ে চলতে হয় তাদের। সেখানে থাকে রক্তচোষা জোঁক, বিষাক্ত মশা আর গাছের ডালে ও ঝোপে জড়িয়ে থাকা বিষধর সাপ। এর সাথে যোগ হয় বিষাক্ত বল্লার কামড়। বল্লা তাড়াতে শুকনো বেতের পাতা ও আঁশে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি করতে হয়।

এই গ্রামে ১৬ জন কারিগর মিলে একটি যৌথ দল গঠন করে কাজ করেন। সম্প্রতি তারা ১০১ শতকের একটি বেতের ক্ষেত এক লাখ ১৯ হাজার টাকায় কিনেছেন।

শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও এখানকার মানুষের কাজে বাধা হতে পারেনি। একটি দুর্ঘটনায় এক পা হারানো নিতাই দাদার মতো কারিগরও লাঠিতে ভর দিয়ে এই পিচ্ছিল কাদা ও ডোবার পানিতে নেমে বেত কাটেন। গভীর কাদার ভেতর দিয়ে একেকজন কারিগরকে প্রায় ৪০ কেজির বেতের বোঝা মাথায় বা কাঁধে করে ডাঙায় তুলতে হয়।

কাটা বেত সমভাবে বণ্টনের জন্য কারিগররা একটি গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী লটারি প্রথা অনুসরণ করেন, যাকে তারা ‍‍`গুল‍‍` বলে থাকেন। প্রতিটি বোঝার ওপর কারিগরদের ব্যবহৃত গামছা ছুড়ে দেওয়া হয়; যার গামছা যে বোঝার ওপর পড়ে, সে-ই সেই অংশের মালিক হন। এতে কারও কোনো ক্ষোভ বা অসন্তোষ থাকে না।

বেত কাটার পর শুরু হয় প্রক্রিয়াজাতকরণের দ্বিতীয় পর্ব। ধারালো দা দিয়ে বেত চিরে ভেতরের অংশ আলাদা করা হয়, যাকে কারিগররা ‍‍`মাঝি‍‍` বলেন। বেতের সবচেয়ে উপরিভাগের মিহি ও মসৃণ অংশটিকে বলা হয় ‍‍`নেল‍‍`। এই নেল দিয়েই বোনা হয় আসল শীতল পাটি, যা ব্লেডের মতো ধারালো হওয়ায় কারিগররা নখে প্লাস্টিকের আবরণ বা পুরোনো খোসা পেঁচিয়ে নেন। অন্যদিকে ভেতরের অপেক্ষাকৃত খসখসে অংশ দিয়ে বোনা হয় মোটা পাটি, যাকে স্থানীয় ভাষায় ‍‍`বোকা‍‍` বলা হয়।

তোলা বেত সরাসরি রোদে শুকানো যায় না। কারিগররা বেতগুলো ভাতের মাড়ে পুরো একদিন ভিজিয়ে রাখেন। মাড়ে ভেজানোর ফলেই বেত ধবধবে সাদা রূপ নেয়। এরপর তা পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফুটন্ত তাপে সেদ্ধ করা হয়। নকশা তোলার জন্য কিছু বেতে লাল ও বেগুনি রঙের মিশ্রণ দেওয়া হয়।

পুরুষরা বেত কেটে ও প্রক্রিয়াজাত করে ঘরে পৌঁছে দেওয়ার পর নারীরা শুরু করেন পাটি বোনার কাজ। আঙুল দিয়ে গুনে গুনে একেকটি হালি মিলিয়ে অত্যন্ত নিপুণ হাতে এই পাটি তৈরি করতে হয়। হাত কেটে রক্ত ঝরলেও আঙুলে কাপড়ের টুকরো বা টেপ পেঁচিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন তারা।

একটি ভালো মানের এক নম্বর শীতল পাটি বুনতে দুইজনের অন্তত তিন থেকে চার দিন টানা সময় লাগে। সপ্তাহে একটি পরিবারে সর্বোচ্চ দুইটি পাটি তৈরি করা সম্ভব হয়।

বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিকের মাদুর ও আধুনিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার প্রসারের কারণে প্রাকৃতিক এই শীতল পাটির চাহিদা ও দাম তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। একটি এক নম্বর শীতল পাটি বিক্রি হয় মাত্র এক হাজার থেকে এক হাজার ৩০০ টাকায়, আর বোকা পাটির দাম ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

কারিগররা জানান, চরম শারীরিক পরিশ্রমের বিপরীতে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে তাদের দৈনিক মজুরি কোনোভাবেই পোষায় না। বিয়ের উপহার ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এখনো কিছুটা চাহিদা থাকলেও ন্যায্য পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে ঐতিহ্যবাহী এই শীতল পাটি একদিন মসলিনের মতো শুধু জাদুঘরের স্মৃতি হয়ে থাকবে।