অক্টোবর ৯, ২০২৬, ১০:৩৯ পিএম
ইন্দোনেশিয়ার দক্ষিণ সুলাওয়েসি প্রদেশের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ তানাতোরাজা ও তোরাজা উতারায় মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়, বরং মৃত্যুর পর শুরু হয় প্রাণহীন আরেক জীবনের অধ্যায়। এখানে মৃত স্বজনকে শেষকৃত্য না করা পর্যন্ত বছরের পর বছর মমি করে বসতঘরের ভেতরেই রেখে দেওয়া হয়। মৃত ব্যক্তির শরীরে পরানো হয় নিত্যনতুন পোশাক, পরিবেশন করা হয় পছন্দের খাবার এবং পরিবারের সদস্যরা তার সঙ্গে স্বাভাবিক আলাপচারিতা চালিয়ে যান। বাইরের মানুষের চোখে অবিশ্বাস্য মনে হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তোরাজান জনগোষ্ঠীর কাছে এটিই স্বাভাবিক পারিবারিক বাস্তবতা।
মৃত্যুকে ঘিরে এই অঞ্চলের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র।
বগিনী ভাষার শব্দ `তোরিয়াজা` থেকে এই জনগোষ্ঠীর নামের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ হলো উঁচু ভূমি বা পাহাড়ের মানুষ। পাহাড়ি অঞ্চলের এই ভূখণ্ডটি পূর্বে তানাতোরাজা নামে একক জেলা হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ২০০৮ সালে এই জেলা ভেঙে উত্তর তোরাজা বা তোরাজা উতারা নামে নতুন একটি প্রশাসনিক এলাকা গঠন করা হয়। এই নতুন অঞ্চলের বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও পর্যটন কেন্দ্র হলো রানতে পাও শহর, যাকে কেন্দ্র করেই তোরাজান সংস্কৃতির মূল গতিধারা প্রবাহিত হয়।
তোরাজান আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় `রাম্বো সালো`। এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ব্যাপক আনুষ্ঠানিকতায় পূর্ণ। তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত বলে গণ্য হন না; বরং তাকে দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরিবারের পক্ষে এই অনুষ্ঠানের বিপুল খরচ জোগাড় করতে তিন থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। যতদিন প্রয়োজনীয় অর্থ ও পশু জোগাড় না হয়, ততদিন মৃতদেহটি রাসায়নিক ও প্রাকৃতিক উপায়ে মমি করে সাধারণ ঘরের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ হিসেবে রেখে দেওয়া হয়।
রাম্বো সালো আয়োজনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে বিপুলসংখ্যক পশু উৎসর্গের নিয়ম রয়েছে। এই অনুষ্ঠানে অন্তত ১২টি মহিষ এবং শতাধিক শুকর বলি দেওয়া বাধ্যতামূলক। ধনী বা অভিজাত পরিবারের ক্ষেত্রে উৎসর্গকৃত মহিষের সংখ্যা ২৪ থেকে ১০০টি পর্যন্ত পৌঁছায়। তোরাজানদের আধ্যাত্মিক বিশ্বাস হলো, বলি দেওয়া মহিষের আত্মা মৃত ব্যক্তির আত্মাকে পরকালে অর্থাৎ `পুয়া` নামক স্বর্গরাজ্যে নিরাপদে পৌঁছে দিতে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে। যে পরিবার যত বেশি মহিষ উৎসর্গ করতে পারে, সমাজে তাদের মর্যাদা তত বেশি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পাহাড়ের ঢালে তাদের স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত চমকপ্রদ।
গ্রামীণ জনপদে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী বিশালাকার কাঠের বাড়ি, যাকে বলা হয় `তঙ্কনান`। নৌকার তলদেশ বা মহিষের শিংয়ের মতো বাঁকানো ছাদবিশিষ্ট এই বাড়িগুলো লাল, কালো ও হলুদ রঙের নকশায় খোদাই করে সাজানো হয়। বাড়ির সদর দরজার সামনের অংশে সারিবদ্ধভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয় বলি দেওয়া মহিষের শিং, যা দেখে পরিবারের আভিজাত্য পরিমাপ করা যায়। তঙ্কনানের পাশেই থাকে আকারে কিছুটা ছোট শস্যভাণ্ডার, যার স্থানীয় নাম `আলাং`। প্রতিটি গ্রামের খোলা প্রান্তরে যেখানে বহু তঙ্কনান ও আলাং একসঙ্গে থাকে, সেই স্থানকে বলা হয় `রানতে`। এই রানতেই তাদের যাবতীয় সামাজিক, ধর্মীয় ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
অতীতে এই অঞ্চলের অর্থনীতি মূলত পাহাড়ি ধাপের ধান চাষ, কাসাভা ও ভুট্টা উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল। একই সাথে বলিদান ও ভোগের জন্য মহিষ, শুকর ও মুরগি পালনে বিপুল শ্রম ব্যয় করত তারা। পরবর্তীকালে কফি এই অঞ্চলের প্রথম প্রধান অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে বৈশ্বিক বাজারের সাথে যুক্ত করে। ১৯৯৫ সালে জাপানি কফি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন এবং খনি ও তেল শিল্পের বিকাশের পর পেশাগত রূপান্তর শুরু হয়। ১৯৮৫ সালের পর থেকে তোরাজানদের একটি বড় অংশ বিদেশে পাড়ি জমান এবং প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বর্তমানে তাদের এই ব্যয়বহুল শেষকৃত্য পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা রাখে।
এই জনপদের ধর্মীয় রূপান্তরের ইতিহাসও বেশ জটিল। তোরাজানদের আদি ধর্মের নাম `অলুক তোদোলো`, যার অর্থ পূর্বপুরুষের পথ বা অতীত মানুষদের বিশ্বাস। এটি মূলত সর্বপ্রাণবাদ বা অ্যানিমিজম এবং বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসের একটি সমন্বয়, যেখানে সর্বোচ্চ স্রষ্টা হিসেবে `পুয়াং মাতুয়া`-কে মান্য করা হয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ডাচ মিশনারিরা এই অঞ্চলে খ্রিস্টধর্ম প্রচার শুরু করলেও স্থানীয় অভিজাতরা তা প্রত্যাখ্যান করেছিল। ১৯৩০-এর দশকে সমতলের মুসলিমদের সাথে সংঘাতের মুখে তোরাজানরা সুরক্ষার তাগিদে ডাচদের দ্বারস্থ হয় এবং পরবর্তীতে তাদের সিংহভাগ খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। বর্তমান জনগোষ্ঠীর অধিকাংশ খ্রিস্টান এবং একটি অংশ মুসলিম হলেও কেউই তাদের আদি সাংস্কৃতিক আচার ও রাম্বো সালো বিসর্জন দেননি।
রাম্বো সালো শেষে মৃতদেহ সাধারণ মাটিতে কবর দেওয়া হয় না। পাহাড়ের খাড়া পাথুরে দেয়াল কেটে তৈরি করা গুহা সমাধিতে কফিনে ভরে লাশটি রাখা হয়। ধনী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সমাধিস্থলের সামনে `বাতু সিম্বুয়াং` নামক প্রাগৈতিহাসিক মেগালিথ বা পাথরের স্তম্ভ স্থাপন করা হয়, যার জন্য কমপক্ষে ২৪টি মহিষের উৎসর্গ প্রয়োজন হয়। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পরও তাদের সম্পর্ক শেষ হয় না। প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর `মানে নে` উৎসবের অংশ হিসেবে পাথরের সমাধি থেকে কফিন বের করে আনা হয়। কফিন খুলে মমি করা মৃতদেহ বের করে পরিষ্কার করা হয়, নতুন পোশাক পরানো হয়, তাদের মুখে প্রিয় সিগারেট বা খাবার তুলে দেওয়া হয় এবং শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে পুনরায় সমাধিতে ফিরিয়ে রাখা হয়।
বাংলাদেশ থেকে এই জনপদে ভ্রমণের যাতায়াত পথও বেশ সুনির্দিষ্ট। ঢাকা থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর হয়ে এয়ার এশিয়ার মাধ্যমে দক্ষিণ সুলাওয়ের প্রাদেশিক রাজধানী মাকাসারে পৌঁছাতে হয়। মাকাসার থেকে তোরাজা উতারার দূরত্ব প্রায় ৩৮০ কিলোমিটার। মাকাসার থেকে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে পালপো শহরের বিমানবন্দরে নামা যায়। পালপো থেকে সড়কপথে রানতে পাও শহরের দূরত্ব প্রায় ৬০ কিলোমিটার, যা পাহাড়ি পথে পাড়ি দিতে সময় লাগে আনুমানিক আড়াই ঘণ্টা। রানতে পাও শহরে যোগাযোগের জন্য মিস্টার আরুর মতো অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইডদের সহায়তা নেওয়া যায়। সেখানে থাকার জন্য স্থানীয়দের পরিচালিত নিরিবিলি হোটেল রয়েছে, যেমন নদীর তীরে অবস্থিত পিয়াজ পাপিস হোটেল, যেখানে প্রতি রাতে স্ট্যান্ডার্ড ডাবল রুমের ভাড়া আনুমানিক আড়াই হাজার টাকা।
রানতে পাও এবং এর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে আত্মীয়স্বজনরা দূরদূরান্ত থেকে এসে সপ্তাহব্যাপী সমবেত হন। অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য নির্মিত উঁচু কাঠের মাচা বা `লাকিয়ান`-এর ওপর কফিন তুলে রেখে সম্মিলিতভাবে শোক ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। শোককে একটি পূর্ণাঙ্গ সামাজিক ও আধ্যাত্মিক পুনর্মিলনীতে পরিণত করার এই জীবনাচরণ তোরাজা সংস্কৃতিকে পৃথিবীর বুকে অনন্য বৈশিষ্ট্যে প্রতিষ্ঠিত করে রেখেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন