অক্টোবর ২৭, ২০২৬, ০৪:৫৬ পিএম
টোকিওতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকে দুদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ়করণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অংশীদারত্ব জোরদারে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জাপানের স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘কান্তেই’তে অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে উভয় সরকারপ্রধানের মধ্যকার এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তির লক্ষ্য অর্জনে জাপান সরকার ও তাদের শক্তিশালী বেসরকারি খাতকে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার জোর আহ্বান জানান।
বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি প্রধান অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের কেন্দ্রে রূপান্তরের রূপরেখা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, চলমান সংস্কার ও পরিকল্পনার সুবাদে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়া শুরুর দিকের দেশগুলোর একটি জাপান, যারা স্বাধীনতার পর থেকেই বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে। তিনি তার পিতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুই দফা জাপান সফর এবং মাতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের অনন্য ভূমিকার কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন এবং এই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতাকে আরও উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প নেই জানিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি। এশিয়ার জ্বালানি সুরক্ষায় ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন জরুরি সহায়তা ঋণের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) অবকাঠামো, আধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চপ্রযুক্তি ও গবেষণানির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে একটি বিশেষ ‘বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক’ প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রস্তাবিত এই পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ওপর অগ্রাধিকার নির্ধারণের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি জাপানি বিনিয়োগকারী ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিবিদ ও উদ্ভাবকদের সেতুবন্ধ তৈরি করবে। একই সাথে মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশল প্রযুক্তিতেও জাপানের অগ্রগতির অংশীদার হতে আগ্রহ দেখায় বাংলাদেশ।
যোগাযোগ ব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তনে দেশের প্রধান ছয়টি বিভাগীয় শহরকে সরাসরি সংযুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশজুড়ে পরিকল্পিত উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। এই মেগা প্রকল্পগুলোর নকশা প্রণয়ন, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহায়তা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে জ্বালানি, যোগাযোগ অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ১ ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমূল্যের বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয় এবং এই পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করতে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের জাপানি প্রতিনিধি দল ঢাকায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জাপানি ব্যবসায়ী ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য করনীতি, কাস্টমস ও অর্থ প্রত্যাবাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন সরকারপ্রধান।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে জাতিসংঘ, মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে সমর্থন দেওয়ায় জাপানের প্রতি ধন্যবাদ জানান তারেক রহমান।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে জাপানের অব্যাহত কূটনৈতিক ভূমিকা কামনা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল সমাধান কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরেই বিদ্যমান। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে মন্ত্রীপর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন