অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
গ্রামীণ মেঠোপথের দুই পাশে সবুজের সমারোহ, বাড়ির উঠান কিংবা ফসলি জমির আইলে এখন সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে তেজপাতা গাছ। বাতাসে দুলতে থাকা সবুজ পাতার মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকা জুড়ে। রংপুরের প্রত্যন্ত জনপদ এখন পরিচিতি পেয়েছে তেজপাতার গ্রাম হিসেবে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের সাদ্রা, রাজিব, বিনোদমাঝি ও বুড়িরহাটসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখন কেবলই তেজপাতার বাগান চোখে পড়ে। একসময় কেবল রান্নার মসলা হিসেবে গৃহস্থের বসতবাড়ির আনাচে-কানাচে অযত্নে বেড়ে ওঠা এই গাছটিই এখন কৃষকের অর্থকরী ফসলে রূপ নিয়েছে। কাউনিয়া ছাড়িয়ে এই মসলার বাণিজ্যিক আবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে।
তুলনামূলক কম পরিচর্যা, নামমাত্র উৎপাদন খরচ এবং পোকা-মাকড়ের আক্রমণ কম হওয়ায় স্থানীয় চাষিদের মাঝে তেজপাতা চাষ ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। সনাতন ফসলে যেখানে সার ও কীটনাশকের পেছনে মোটা অঙ্কের খরচ গিয়ে লাভের মুখ দেখা কঠিন হয়, সেখানে তেজপাতা আবাদে তেমন কোনো বাড়তি ঝামেলাই পোহাতে হয় না। দেড় একর জমিতে তেজপাতার বাগান করে চলতি মৌসুমে তিন লাখ একশ টাকা আয় করেছেন এক স্থানীয় কৃষক। চাষিরা জানান, ধানের আবাদের তুলনায় এতে শারীরিক খাটুনি ও পরিচর্যার খরচ অত্যন্ত কম, অথচ আয়ের দিক থেকে এটি অনেক বেশি লাভজনক।
উৎপাদিত তেজপাতা বিক্রির জন্য কৃষকদের এখন আর হাটে হাটে ঘুরতে হয় না। দেশের শীর্ষস্থানীয় করপোরেট ও ইউনানি প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি কৃষকদের মাঠ থেকেই এসব তেজপাতা কিনে নিচ্ছে। স্কয়ার গ্রুপ, প্রাণ, তীর ও পুষ্টির মতো বৃহৎ খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি এই পাতা মধ্যপ্রাচ্যের দেশ সৌদি আরব ও দুবাইয়ে রপ্তানি হচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের জন্য তৈরি হয়েছে একটি নিশ্চিত ও টেকসই বাজার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব বলছে, রংপুর অঞ্চলে বর্তমানে একশ হেক্টরেরও বেশি জমিতে তেজপাতার সুপরিকল্পিত আবাদ হচ্ছে, যা থেকে প্রতি বছর পাঁচ কোটি টাকার বেশি আয় আসছে। প্রতি হেক্টরে প্রায় এক হাজার একশ থেকে এক হাজার দুইশটি চারা রোপণ করতে হয় এবং উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় এক লাখ পাঁচ হাজার থেকে এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। হেক্টর প্রতি প্রায় ১৭ টন কাঁচা পাতা পাওয়া যায়, যা প্রক্রিয়াজাত করে শুকানোর পর প্রায় সাড়ে চার টন শুকনো পাতায় রূপ নেয়।
বাজারমূল্য অনুযায়ী হেক্টর প্রতি পাতা বিক্রি করে কৃষকের মোট আয় আসে তিন লাখ ২০ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। সব ধরনের উৎপাদন খরচ বাদ দিয়ে প্রতি হেক্টরে কৃষকের নিট মুনাফা থাকে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, রংপুর অঞ্চলের বেলে দোআঁশ ও দোআঁশ মাটি তেজপাতা চাষের জন্য দারুণ উপযোগী হওয়ায় রান্নার স্বাদ ও সুবাস বাড়ানোর পাশাপাশি ঔষধি গুণের এই উদ্ভিদটি উত্তরের গ্রামীণ অর্থনীতিতে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন