অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০১:১৮ পিএম
ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দীর্ঘদিনের যানজট কমিয়ে গণপরিবহনে যাত্রীসেবার মান নিশ্চিত করতে চারটি সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং পরিবহন মালিক সমিতির প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনা করে এই মহাপরিকল্পনার তথ্য জানা গেছে।
রাজধানীর পরিবহন খাতে বড় পরিবর্তনের তোড়জোড় চলছে।
প্রস্তাবিত উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে ২০ বছরের বেশি পুরোনো বাস সড়ক থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার, গুরুত্বপূর্ণ এলাকার আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল শহরের প্রান্তে স্থানান্তর, পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কার ও পুনর্বিন্যাস এবং অটোরিকশা চলাচলে একটি সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে সড়কে যানবাহনের বিশৃঙ্খলা কমবে এবং সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে এজন্য সময়সীমা নির্ধারণ, বিকল্প যানবাহনের জোগান এবং সংস্থাগুলোর সমন্বয় থাকা জরুরি।
সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানান, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো পদক্ষেপ নিয়ে ঢাকার জটিল যানজট নিরসন করা অসম্ভব। পুরোনো বাস অপসারণ, টার্মিনাল ব্যবস্থাপনা, ৩১টি রুট সংস্কার এবং অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণকে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে এনে কাজ করছে সরকার। তিনি স্পষ্ট করেন, যাত্রীদের ভোগান্তি কমানো, সড়ক নিরাপত্তা জোরদার এবং গণপরিবহনকে কার্যকর রাখাই মূল লক্ষ্য।
রাজধানীর যানজট এখন কেবল যাতায়াতের কষ্টেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি নগরীর অর্থনীতি, উৎপাদনশীল কর্মঘণ্টা, জ্বালানি খরচ, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর মারাত্মক চাপ তৈরি করছে। প্রতিদিন কর্মজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়কে আটকে থাকতে হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নতুন ফ্লাইওভার নির্মাণ করে ঢাকার যানজটের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিকার মিলবে না; প্রয়োজন বিদ্যমান সড়কের সঠিক ব্যবহার, বাসের মান নিয়ন্ত্রণ এবং বিভিন্ন পরিবহনের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখা।
ফিটনেসবিহীন ও পুরোনো বাসগুলো অতিরিক্ত কালো ধোঁয়া নির্গমন এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সড়ক নিরাপত্তা ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ২০ বছরের পুরোনো বাস প্রত্যাহারের পরিকল্পনাকে ইতিবাচক দেখা হলেও বিকল্প বাসের ব্যবস্থা না থাকলে যাত্রীদের ভোগান্তি বাড়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে চালকদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, নিয়মিত ফিটনেস পরীক্ষা এবং নতুন বাসের অর্থায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সায়েদাবাদ, গাবতলী, মহাখালী ও গুলিস্তানের মতো কেন্দ্রীয় এলাকায় বাস পার্কিং, যাত্রী ওঠানামা এবং আন্তঃজেলা বাসের যাতায়াত মূল সড়কে স্থবিরতা সৃষ্টি করে। এসব টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর করা হলে কেন্দ্রীয় সড়কের চাপ অনেকটাই কমবে। তবে নতুন টার্মিনালের অবস্থান থেকে শহরের ভেতরে প্রবেশের জন্য মেট্রোরেল, দ্রুতগতির বাস বা অন্যান্য সংযোগ পরিবহন নিশ্চিত করা না গেলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। এ কারণে টার্মিনালে প্রবেশ ও বের হওয়ার সুনির্দিষ্ট পথ, অপেক্ষার স্থান এবং অভ্যন্তরীণ পরিবহনের সংযোগকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার বড় অংশ হিসেবে পুরোনো ৩১টি সড়ক রুট সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই পথে একাধিক কোম্পানির অসুস্থ প্রতিযোগিতা, যত্রতত্র যাত্রী তোলার জন্য হঠাৎ লেন পরিবর্তন এবং নির্দিষ্ট স্টপেজের বাইরে বাস থামানোর বিশৃঙ্খলা বন্ধ করাই এর উদ্দেশ্য। যাত্রীদের চলাচলের ধরন, অফিস-আদালত, স্কুল ও হাসপাতালের অবস্থান এবং মেট্রোরেল সংযোগ বিবেচনায় রেখে রুট পুনর্বিন্যাস করা হবে, যাতে কোনো এলাকার মানুষ পরিবহনসেবা থেকে বঞ্চিত না হন।
একই সাথে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ তিন চাকার যানের চলাচল নিয়ন্ত্রণে নতুন নীতিমালা তৈরি করা হচ্ছে। এতে যানবাহনের নিবন্ধন, চালকের যোগ্যতা, চলাচলের এলাকা ও নিরাপত্তার মান নির্ধারণ করা থাকবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে বিকল্প স্ট্যান্ড ও সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সড়ক পরিবহন ও সেতু বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক বলেন, কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি বাস্তবায়নযোগ্য সময়সীমা, দায়িত্ব বণ্টন ও অগ্রগতি মূল্যায়ন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, ডিটিসিএ, দুই সিটি করপোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ ও পরিবহন মালিকদের যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমেই ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন