বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,
সাহিত্যে প্রয়াণ দিবস

জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী স্মরণ

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৬, ১১:০৬ এএম

জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী স্মরণ

জীবনানন্দ দাশের ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ পালিত হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধা ও সাহিত্য মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে। রূপসী বাংলার এই দিকপাল কবি ১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে এক মর্মান্তিক ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। পরবর্তীতে আট দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে কলকাতার শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী সাহিত্যিক। সেই ট্রাম দুর্ঘটনাটি নিছক কোনো দুর্ঘটনা ছিল নাকি কবির স্বেচ্ছামৃত্যু বা আত্মহত্যা ছিল, তা নিয়ে আজও গবেষক ও সাহিত্যবোদ্ধাদের মহলে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

বাংলা কাব্যজগতে তিনি এনেছিলেন সম্পূর্ণ নতুন এক স্বর।

আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে নিভৃতচারী ও একা মানুষ ছিলেন তিনি। জীবদ্দশায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি কিংবা পাঠকমহলে প্রাপ্য সমাদর তিনি খুব একটা পাননি; কাটিয়েছেন চরম অবহেলা ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের নিঃসঙ্গ জীবন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রবল প্রভাববলয় থেকে কাব্যজগতকে বের করে এনে তিনি উপহার দিয়েছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অনুভূতি, স্বতন্ত্র শব্দচয়ন এবং নিজস্ব বিষণ্নতার ঘোর। তৎকালীন সাহিত্যিক সমাজের অনেকেই তার কবিতার জটিল মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাস, আধুনিক উপমা ও প্রতীকী রূপককে সহজে মেনে নিতে পারেননি। তবে কালের বিচারে সময়ের ব্যবধানে তিনিই আবির্ভূত হয়েছেন আধুনিক বাংলা কবিতার সবচেয়ে অনিবার্য কণ্ঠ হিসেবে।

মৃত্যুর সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার রচিত কবিতার মায়াবী জগত আজও সংবেদনশীল পাঠককে সমানভাবে টেনে রাখে। সমকালীন প্রখ্যাত কবি বুদ্ধদেব বসু তাকে যথার্থই আখ্যা দিয়েছিলেন ‍‍`নির্জনতম কবি‍‍` হিসেবে। তিনি কেবল পল্লীবাংলার নিসর্গ ও শ্যামল সৌন্দর্য আঁকেননি, বরং সমকালীন নাগরিক জীবনের ক্লান্তি, হতাশা, বিষাদ এবং মানব অস্তিত্বের গভীরে থাকা জটিল মনস্তত্ত্ব তুলে ধরেছেন অসাধারণ শৈল্পিকতায়। ধানসিঁড়ি নদীকে তিনি এমন এক কাব্যিক মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যা পাঠককে বারবার বাংলার প্রকৃতির চিরায়ত রূপের কাছে ফিরিয়ে আনে। তার সেই অমর উচ্চারণ পাঠকদের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছে: ‍‍`আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে – এই বাংলায় / হয়তো মানুষ নয় – হয়তো বা শঙখচিল শালিখের বেশে‍‍`।

জীবদ্দশায় কবির মাত্র সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। মৃত্যুর পর তার পারিবারিক ট্রাঙ্ক ও অবহেলিত পাণ্ডুলিপিগুলো উদ্ধার করা হলে সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অপ্রকাশিত কবিতার পাশাপাশি একাধিক সমৃদ্ধ উপন্যাস ও ছোটগল্পের সন্ধান মেলে, যা পরবর্তীতে বাংলা সাহিত্যে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করে।

তার রচিত কালজয়ী কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‍‍`ঝরা পালক‍‍`, ‍‍`ধূসর পাণ্ডুলিপি‍‍`, ‍‍`বনলতা সেন‍‍`, ‍‍`মহাপৃথিবী‍‍`, ‍‍`সাতটি তারার তিমির‍‍` এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত ‍‍`রূপসী বাংলা‍‍`। এর মধ্যে ‍‍`বনলতা সেন‍‍` কবিতাটি বাংলা ভাষার সর্বকালের অন্যতম সেরা রোমান্টিক সৃষ্টি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত। কবিতার বাইরে তার লেখা ‍‍`মাল্যবান‍‍` ও ‍‍`সুতীর্থ‍‍`-এর মতো উপন্যাস এবং ‍‍`কবিতার কথা‍‍` নামক তাত্ত্বিক প্রবন্ধগ্রন্থ আধুনিক চিন্তার অনন্য স্মারক হিসেবে বিবেচিত।

ব্যক্তিগত জীবনে চারপাশের বৈরী সমাজ, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং পারিবারিক টানাপোড়েনের শিকার হয়েও তিনি সত্য ও সৌন্দর্যের অন্বেষণ থামাননি। বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধের কবিদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা কবিতার প্রধান আলোকবর্তিকা। আজকের যান্ত্রিক ও কোলাহলপূর্ণ জগতেও তার কবিতা মানুষকে নিজের ভেতরের গভীর নির্জনতার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এই মহান কবি। তার পরিবার মূলত ঢাকা জেলার তৎকালীন বিক্রমপুর পরগণার কুমারভোগের গাওপাড়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। পরবর্তীতে মূল গ্রামটি পদ্মা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেলে ১৮৮৩ সালের দিকে বিক্রমপুর ছেড়ে বরিশালে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে কবি পরিবার।