অক্টোবর ২২, ২০২৬, ১০:৫১ এএম
দেশের অন্যতম প্রধান শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দিনাজপুরে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে আগাম শীতকালীন সবজি চাষে ব্যাপক ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কৃষকরা। মৌসুমের স্বাভাবিক সময়ের আগেই বাজারে সবজি তুলে অধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে জেলার সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার চাষিরা এখন ক্ষেত পরিচর্যায় দিনরাত পরিশ্রম করছেন। ইতিমধ্যে আগাম জাতের কিছু সবজি বাজারে আসতে শুরু করেছে এবং কৃষকরা বেশ ভালো দাম পাচ্ছেন।
সাধারণত প্রতি বছর নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ উপচে পড়ে। সেই ভরা মৌসুমে অতিরিক্ত জোগানের কারণে কৃষকেরা প্রায়ই ফসলের উপযুক্ত দাম থেকে বঞ্চিত হন। তবে আশ্বিনের মাঝামাঝি ও কার্তিক মাসের শুরুতে বাজারে সবজির জোগান কম থাকায় দাম ও ক্রেতাদের চাহিদা দুটোই শীর্ষে থাকে। এই বাণিজ্যিক সুযোগ কাজে লাগাতে চাষিরা সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই উঁচু জমি নির্বাচন করে আগাম চাষের প্রস্তুতি শুরু করেন।
সরেজমিনে দিনাজপুর সদর উপজেলার নশিপুর কর্ণাই, গোলাপগঞ্জ, সুন্দরবন, ফাজিলপুর ও আউলিয়াপুর গ্রামের ফসলের মাঠে ঘুরে দেখা গেছে কৃষকদের কর্মচাঞ্চল্য।
কর্ণাই গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম তার ৬০ শতক জমিকে তিন ভাগে বিভক্ত করে ফুলকপি, বাঁধাকপি, কাঁঠালি বেগুন ও টমেটোর আবাদ করেছেন। অসময়ের বৃষ্টির ঝুঁকি মোকাবিলার জন্য তিনি ক্ষেতে প্রতি তিন ফুট পরপর পরিকল্পিত নালা তৈরি করেছেন, যেন বৃষ্টির পানি জমে শিকড় নষ্ট না হয়। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তিনি ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, টমেটো ও মুলা বাজারে বিক্রি করতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করছেন। কার্তিকের মাঝামাঝি সময়ে এই ফসল বাজারে তুলতে পারলে মোটা অঙ্কের মুনাফা ঘরে তোলা সম্ভব হবে।
একই উপজেলার উলিপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, বিগত কয়েক বছর ধরে আগাম সবজি চাষ করে তারা স্থানীয়ভাবে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন। আধুনিক চাষাবাদ কৌশল অবলম্বনের ফলে একদিকে শারীরিক শ্রম লাঘব হয়েছে, অন্যদিকে আবাদের খরচও অনেকটাই কমে এসেছে।
ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদিপুর গ্রামের কৃষক সহিদ মিয়া চলতি মৌসুমে তার ৩২ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপির চাষ করেছেন। চারা রোপণ ও প্রাথমিক পরিচর্যায় এ পর্যন্ত তার ২১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে এবং বাজারজাত করা পর্যন্ত মোট ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ২৫ হাজার টাকা। তিনি আশা করছেন আর মাত্র আট থেকে দশ দিনের মধ্যেই ক্ষেতের ফুলকপি হাটে তুলতে পারবেন। গত মৌসুমে একই জমি থেকে তিনি এক লাখ ৩০ হাজার টাকার ফুলকপি বিক্রি করেছিলেন। কপির পাশাপাশি জমিতে এবার শিম ও শসাও আবাদ করেছেন তিনি।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম সবজির চাষ কৃষকদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে তুলছে।
ফুলবাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সাইফ আব্দুল্লাহ মোস্তাফিন জানান, আগাম সবজি অত্যন্ত অর্থকরী ফসল হওয়ায় চাষিদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে। এখান থেকে উৎপাদিত সবজি স্থানীয় মানুষের চাহিদা পূরণ করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে নিয়মিত সরবরাহ করা হচ্ছে। কৃষি বিভাগ রোগবালাই দমন ও আধুনিক পদ্ধতির সঠিক প্রয়োগে কৃষকদের সার্বক্ষণিক পরামর্শ সেবা দিচ্ছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমে জেলার মোট ১৩টি উপজেলায় ২৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের সবজির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে সাত হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে। এ ছাড়া জেলায় ৩৬ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। আধুনিক কৃষি পদ্ধতির বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত হওয়ায় চাষিরা সবজি ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে দিন দিন আরও একধাপ এগিয়ে যাচ্ছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন