অক্টোবর ২১, ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
বছরের সিংহভাগ সময় ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে থাকলেও সেই থইথই পানির ওপরেই বিশেষ ধাপ তৈরি করে ফলানো হচ্ছে হরেক রকমের শাকসবজি ও চারা।
পানির উচ্চতা বাড়লে এই ক্ষেতগুলোও ওপরের দিকে ভেসে ওঠে, আবার পানি কমলে ধাপে ধাপে নিচে নেমে যায়। প্রকৃতির বৈরী আচরণের সঙ্গে এভাবেই সফল লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন দেশের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তিক কৃষকেরা।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার নিচু জনপদে বর্ষা মৌসুমে পানির স্তর অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে প্রচলিত মাটিতে চাষাবাদ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে চাষিদের জীবিকার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে বংশপরম্পরায় চলে আসা ঐতিহ্যবাহী ভাসমান কৃষিপদ্ধতি।
কচুরিপানা, শেওলা এবং নানা জাতের জলজ উদ্ভিদ স্তরে স্তরে জমিয়ে তৈরি করা হয় এসব দীর্ঘ ভাসমান ধাপ বা বেড। সময়ের আবর্তে এসব উদ্ভিদের স্তর পচে গিয়ে খাঁটি জৈব উপাদানে রূপ নেয়, যা উদ্ভিদের পুষ্টি জুগিয়ে চারা দ্রুত বাড়তে সাহায্য করে। এরপর এই ধাপগুলোর ওপর বিশেষ বীজতলা বানিয়ে বিভিন্ন শাকসবজির চারা রোপণ করা হয়। চারপাশে পানি থইথই করলেও এভাবে কোনো ক্ষতি ছাড়াই সবজির উৎপাদন নিরবচ্ছিন্ন রাখা সম্ভব হয়।
স্থানীয় এক প্রবীণ চাষি জানান, তাঁর জন্ম থেকেই তিনি এই বিশেষ পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন হতে দেখছেন। তাঁর বাবা এবং দাদার আমলেও একইভাবে ভাসমান চাষ চলত। পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্য এখন তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মও সফলভাবে ধরে রেখেছে। জমিতে আকস্মিক পানি উঠলেও এই ভাসমান বেডের চারা বিন্দুমাত্র নষ্ট হয় না। এখানকার মাটি ও পানির সংস্পর্শে উৎপাদিত চারার শিকড় অক্ষত থাকে বলে জমিতে রোপণের পর তা খুব দ্রুত মাটিতে শিকড় গেড়ে সতেজ হয়ে ওঠে। ফলে বাজারে এই চারার বিশেষ বাণিজ্যিক চাহিদা রয়েছে।
চলতি বছর অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার কারণে দেশের বিভিন্ন নিচু এলাকায় প্রচলিত চাষাবাদ মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এমন নাজুক প্রেক্ষাপটে প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন এই জলবায়ু সহনশীল কৃষি কৌশল চাষিদের জন্য বিকল্প খাদ্য নিরাপত্তার পথ দেখাচ্ছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, একই পরিমাণ সমতল জমিতে প্রচলিত চাষের তুলনায় এই ভাসমান পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন