বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬,

কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪২ শতাংশে ঠেকেছে ব্যাংকগুলোতে গভীর শঙ্কা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২১, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ৪২ শতাংশে ঠেকেছে ব্যাংকগুলোতে গভীর শঙ্কা

একসময় ব্যাংক খাতের অন্যান্য খাতের তুলনায় কম থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণ। গত আগস্ট শেষে কৃষি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশই খেলাপি হয়ে পড়েছে। যেখানে পুরো ব্যাংক খাতে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ, সেখানে কৃষিতে এই হার দশ শতাংশের বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত আগস্ট মাস শেষে কৃষি খাতে মোট ঋণস্থিতি দাঁড়িয়েছে ৭০ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা। এর মধ্যে অনাদায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ পৌঁছেছে ২৯ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকায়, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪২ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অথচ মাত্র দুই মাস আগে, গত জুন শেষে এ খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ১৮ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা বা ২৯ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ একলাফে বেড়েছে ১১ হাজার ২৭১ কোটি টাকা।

দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কৃষি খাত। মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ এবং দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৬ শতাংশ এই কৃষি খাতের ওপর নির্ভরশীল। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এই খাতের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে ঋণ বিতরণে বরাবরই বিশেষ জোর দেয় সরকার।

এমনকি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই শস্য, ফসল, মৎস্য ও পশুপালন খাতে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ সম্পূর্ণ মওকুফের ঘোষণা দিয়েছিল। এর ফলে প্রায় ১২ লাখ কৃষকের এক হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ মাফ করা হয়। তবে এরপরেও কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফনের মূল উৎস ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে জারি করা নতুন ঋণ শ্রেণিকরণ ও নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংক্রান্ত নীতিমালা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রণীত ওই নীতিমালায় বলা হয়, ঋণের কিস্তি বা সম্পূর্ণ টাকা পরিশোধের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকেই তা বকেয়া হিসেবে গণ্য হবে। বকেয়ার মেয়াদের ভিত্তিতেই ঋণকে নিয়মিত ও খেলাপি হিসেবে ভাগ করা হয়। আন্তর্জাতিক মানের আলোকে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা কঠোর করায় এবং সময় বাড়ানোর সুবিধা বা গ্রেস পিরিয়ড কমিয়ে আনায় কৃষকদের বিপুল অঙ্কের ঋণ একযোগে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই কঠোর নীতিমালা কার্যকরের আগে, ২০২৪ সালের জুন শেষে কৃষি খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র তিন হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা।

খেলাপি বৃদ্ধির চাপের মধ্যেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) কৃষি ও পল্লি খাতে ছয় হাজার ৮৫৮ কোটি টাকার নতুন ঋণ বিতরণ করেছে তফসিলি ব্যাংকগুলো। এই অঙ্ক চলতি অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত মোট লক্ষ্যমাত্রার ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। গত অর্থবছরের একই সময়ে ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল চার হাজার ৮২৬ কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কৃষিঋণ বিতরণ বেড়েছে দুই হাজার ৩২ কোটি টাকা বা ৪২ দশমিক ১১ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি খাতে মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক, যা গত অর্থবছরের ৩৯ হাজার কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছরে এই খাতে ব্যাংকগুলো মোট ৪২ হাজার ৮৩৪ কোটি ১৬ লাখ টাকা বিতরণ করতে পেরেছিল।

কৃষি কার্যক্রমের আধুনিকায়নে এবার ঋণ কর্মসূচির আওতা আরও বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে হ্যাচারিতে মাছের পোনা উৎপাদন, হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন ও উট পালনের মতো বাণিজ্যিক কৃষির উদ্যোগগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বিতরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে ঋণ আদায়ের গতিও ইতিবাচক ছিল। জুলাই ও আগস্ট মাসে কৃষি খাত থেকে সাত হাজার ৪১৯ কোটি টাকা আদায় করতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকগুলো। আগের অর্থবছরের একই সময়ে আদায় হয়েছিল ছয় হাজার ৭৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে ঋণ আদায় বেড়েছে এক হাজার ৩৪৬ কোটি টাকা বা ২২ দশমিক ২১ শতাংশ।