মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গবেষণা

ডিজিটালের তুলনায় নগদ লেনদেনে ব্যয় ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ২০, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

ডিজিটালের তুলনায় নগদ লেনদেনে ব্যয় ২৮ গুণ বেশি: বাংলাদেশ ব্যাংক

কাগজের নগদ টাকার পরিবর্তে ডিজিটাল মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন সম্প্রসারণ করা সম্ভব হলে জাতীয় অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ পরিচালন ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক বিশদ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত নগদ লেনদেন ব্যবস্থাপনায় বছরে যে আর্থিক ক্ষতি ও ব্যয় হয়, ডিজিটাল ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তা প্রায় ২৮ ভাগের মাত্র এক ভাগ। অর্থাৎ ডিজিটাল পদ্ধতির তুলনায় নগদ টাকা ব্যবস্থাপনায় পরিচালন ব্যয় প্রায় ২৮ গুণ বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‍‍`দ্য কস্ট অব ক্যাশ স্টাডি ইন বাংলাদেশ: আ কম্পারেটিভ অ্যানালাইসিস অব ক্যাশ অ্যান্ড ডিজিটাল পেমেন্ট‍‍` শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে নগদ লেনদেনের সামগ্রিক বার্ষিক ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা, যা ওই বছরের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর বিপরীতে সমন্বিত ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার বার্ষিক পরিচালন ব্যয় ছিল পাঁচ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা, যা বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ১১ শতাংশ।

মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয়ের হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি নাগরিকের বিপরীতে নগদ লেনদেনে বছরে খরচ হয় নয় হাজার ৯৩৮ টাকা। অন্যদিকে ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে এই খরচের পরিমাণ মাত্র ৩৪৮ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম জানান, নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনার পুরো চক্রের সাথেই উল্লেখযোগ্য আর্থিক বোঝা জড়িত থাকে।

তিনি বলেন, ব্যাংক নোট ছাপানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ কাঁচামাল আমদানি থেকে শুরু করে মুদ্রণ, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন এবং বাজারে টাকার স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে প্রতিনিয়ত বিপুল তহবিল ব্যয় করতে হয়।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, নিয়মিত হাতবদলের কারণে ব্যাংক নোট দ্রুত পুরোনো, ময়লা, ক্ষতিগ্রস্ত ও ছেঁড়া হয়ে যায়। ফলে বাতিলের খাতায় যাওয়া সেসব নোট ধ্বংস করে পুনরায় নতুন নোট ছাপাতে হয়। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে এই রূপ খরচ বারবার আবর্তিত হতে থাকে।

ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধির তাগিদ দিয়ে সিরাজুল ইসলাম বলেন, ইলেকট্রনিক লেনদেন বাড়ানো গেলে এই বিশাল অপচয় তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। একই সাথে ডিজিটাল প্রতিটি আর্থিক লেনদেনের সুনির্দিষ্ট ইলেকট্রনিক রেকর্ড বা তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষিত থাকায় সমাজে দুর্নীতি, সরাসরি চুরি ও আর্থিক তহবিলের অপব্যবহার প্রতিরোধ করা অনেক সহজ হয়।

গবেষণায় বিভিন্ন পক্ষের আলাদা খরচের খতিয়ান তুলে ধরা হয়েছে।

এতে দেখা যায়, শুধু নগদ টাকা লেনদেন ও ব্যবস্থাপনার পেছনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৭০ শতাংশ। ভোক্তাদের নিজেদের পকেট থেকে এই খাতে খরচ হয় ২৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নগদ ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় সরাসরি খরচ হয় বছরে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।

নগদ টাকা ব্যবস্থাপনার এই সামগ্রিক ব্যয়ের মধ্যে রয়েছে কাগজের নোট ও ধাতব মুদ্রা ছাপানো, দেশব্যাপী বিতরণ, সশস্ত্র নিরাপত্তায় অর্থ পরিবহন, বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথ রক্ষণাবেক্ষণ। এর বাইরে সাধারণ মানুষের ব্যাংক থেকে টাকা তোলা, বহন করা ও নগদ লেনদেনের পেছনে নষ্ট হওয়া কর্মঘণ্টার আর্থিক মূল্যও এই হিসাবে যুক্ত হয়েছে।

গবেষণায় নগদ লেনদেনের কারণে দেশের সমান্তরাল বা ছায়া অর্থনীতির বিস্তৃতি এবং এর ফলে সরকারের বিপুল রাজস্ব হারানোর চিত্র সামনে আনা হয়েছে।

প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, নগদ লেনদেনের সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠা ছায়া অর্থনীতির কারণে সরকারের বছরে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এই অঙ্কটি জাতীয় মোট দেশজ উৎপাদনের ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ এবং দেশের মোট প্রাক্কলিত নগদ লেনদেন ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

সরকারের রাজস্ব হারানোর এই বিশাল পরিমাণ হিসাব থেকে বাদ দিলেও দেখা যায়, নগদ লেনদেনের অভ্যন্তরীণ প্রত্যক্ষ খরচ ডিজিটাল ব্যবস্থার তুলনায় প্রায় ১২ গুণ বেশি।

তবে নগদ ব্যবস্থার তুলনায় খরচ বহুগুণ কম হলেও ডিজিটাল লেনদেন কাঠামোর বেশ কিছু আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এখনো বিদ্যমান রয়েছে বলে প্রতিবেদনে চিহ্নিত করা হয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা থেকে বছরে আনুমানিক আয় হয় দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা। কিন্তু এই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত পরিচালন ব্যয় পাঁচ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। ফলে পরিচালন আয় ও ব্যয়ের মধ্যে প্রতি বছর প্রায় তিন হাজার ৬৬৪ কোটি টাকার একটি বড় ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।

ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার প্রসারে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর আরোপিত উচ্চ লেনদেন মাশুল, মার্চেন্ট অ্যাকাউন্টে অর্থ পৌঁছাতে দীর্ঘসূত্রতা বা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পেমেন্ট অ্যাপগুলোর মধ্যে সমন্বিত আন্তসংযোগের অভাব এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবার চরম অনির্ভরযোগ্যতা।

এর পাশাপাশি ডিজিটাল জালিয়াতি, প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে লেনদেন আটকে যাওয়া, অসাবধানতাবশত ভুল নম্বরে টাকা চলে যাওয়া এবং ডিজিটাল প্রযুক্তি পরিচালনায় সাধারণ গ্রাহকদের পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাবের কারণে বহু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক ভোক্তা এখনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে অন্তর্ভুক্ত হতে দ্বিধাগ্রস্ত।

নগদ ও ডিজিটাল ব্যবস্থার তুলনামূলক ব্যয় নিরূপণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ, নীতিমালার পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট খাতের নীতি-নির্ধারকদের সাথে ২১টি গভীর সাক্ষাৎকার এবং পাঁচটি পৃথক দলভিত্তিক যৌথ আলোচনার মাধ্যমে এই গবেষণা সম্পন্ন করে।

গবেষণার তথ্যমতে, মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইনে ব্যাংক ফান্ড ট্রান্সফারের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এখনো কাগজের টাকার একচ্ছত্র আধিপত্য রয়ে গেছে। দেশে মোট সম্পাদিত বাণিজ্যিক লেনদেনের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো সরাসরি কাগজের নোটে সম্পন্ন হয়।

বিশেষ করে প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য ডিজিটাল লেনদেনের অতিরিক্ত মাশুল একটি বড় বাধা। তাদের ব্যবসায়ী মুনাফা এমনিতেই সীমিত থাকে, তার ওপর মাশুল কাটা হলে তাদের মূলধনে টান পড়ে। তাই লেনদেনের নির্দিষ্ট নিয়ম, টাকা জমা হওয়ার সময়সীমা ও প্রকৃত খরচের স্বচ্ছ তথ্য তাদের জানানো জরুরি।

ভোক্তাদের দিক থেকে বিবেচনা করলে ডিজিটাল লেনদেন মূল্যবান সময় ও কায়িক শ্রম বাঁচায় এবং প্রতিটি খরচের হিসাব সংরক্ষণ সহজ করে। তবে এ ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের পূর্ণ আস্থা তৈরি করতে দ্রুত ও সার্বক্ষণিক সেবা, সহজে অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক সমাধানের কার্যকরী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, ডিজিটাল বিপ্লব নিশ্চিত করতে কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বসালেই চলবে না; বরং সাশ্রয়ী মাশুল, নিরবচ্ছিন্ন দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও তৃণমূল পর্যায়ে ব্যাপক আর্থিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

আন্তসংযোগযোগ্য পেমেন্ট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিমধ্যে জাতীয় মানদণ্ড হিসেবে সমন্বিত ‍‍`বাংলা কিউআর‍‍` ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে।

ব্যবসায়ী মহলে এই সেবাকে আরও গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় করতে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে বাংলা কিউআর লেনদেনের ক্ষেত্রে ইন্টারচেঞ্জ রিইম্বার্সমেন্ট ফি সম্পূর্ণ শূন্য শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

তবে উদ্যোগটির সাফল্য নির্ভর করবে সাধারণ দোকানদার ও ভোক্তাদের কাছে এই ব্যবস্থাটি বাস্তবে কতটা সহজ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য মনে হয় তার ওপর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ হলো, ডিজিটাল রূপান্তরের সুফল কোনো একক গোষ্ঠীর পক্ষে অর্জন করা সম্ভব নয়। এর জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, ফিনটেক সেবাদাতা, ব্যবসায়ী সমিতি ও ভোক্তাদের একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে কাজ করতে হবে, যাতে সবার জন্য ডিজিটাল লেনদেন সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।