মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬,
বিষমুক্ত কৃষি

কীটনাশক ছাড়া লাউ চাষে সফল

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ১১:২৩ পিএম

কীটনাশক ছাড়া লাউ চাষে সফল

অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের বিপরীতে কোনো বিষ প্রয়োগ না করেই দেশীয় জৈব কৌশলে হাইব্রিড জাতের লাউ চাষ করে অনুকরণীয় সাফল্য অর্জন করেছেন কৃষক আবু হানিফ ভূইয়া। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমান্তবর্তী আখাউড়া উপজেলার এই কৃষক বিষমুক্ত নিরাপদ সবজি উৎপাদন করে পুরো অঞ্চলে সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

তিনি বসতবাড়ি সংলগ্ন মাত্র ২৫ শতাংশ জমিতে এই লাউ চাষ করেছেন।

ইতিমধ্যেই ক্ষেত থেকে সংগৃহীত তাজা লাউ পুরোদমে বিক্রি শুরু করেছেন তিনি। ফলন আশাতীত ভালো হওয়া এবং বাজারে চড়া চাহিদা থাকায় নিজের পরিবারের খাওয়ার চাহিদা মিটিয়ে ওই জমি থেকে ৬০ হাজার টাকারও বেশি লাউ বিক্রির সুনির্দিষ্ট প্রত্যাশা করছেন আবু হানিফ।

সফল এই চাষি আখাউড়া উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের রাজমঙ্গলপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। তাঁর জমিতে কীটনাশকহীন দৃষ্টিনন্দন ফলন প্রত্যক্ষ করতে স্থানীয় কৃষকদের পাশাপাশি আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কৌতূহলী মানুষ ভিড় করছেন। অনেকেই তাঁর কাছ থেকে দেশীয় পদ্ধতিতে পোকা দমন ও মাটির উর্বরতা রক্ষার পরামর্শ নিচ্ছেন।

কৃষক হানিফ ভূইয়া জানান, তিনি বছরের অধিকাংশ সময়ই ঋতুভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি আবাদ করেন।

প্রায় দুই মাস আগে বাড়ির পাশের ২৫ শতাংশ জমিতে সম্পূর্ণ বিষমুক্ত দেশীয় পরিচর্যায় উচ্চ ফলনশীল হাইব্রিড জাতের লাউ চাষের উদ্যোগ নেন তিনি। জমি প্রস্তুত, উন্নত বীজ কেনা, চারা রোপণ, মাচা তৈরিতে বাঁশ-জালের বেড়া দেওয়া এবং আগাছা পরিষ্কার বাবদ এ পর্যন্ত তাঁর সর্বমোট প্রায় ১৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।

তিনি জানান, নিয়মিত জৈব সার প্রয়োগ ও তদারকির কারণে চারা রোপণের মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় প্রতিটি গাছে প্রচুর সাদা ফুল আসতে শুরু করে। এরপর মাত্র ১০ থেকে ১২ দিনের ব্যবধানে কচি লাউ খাবার ও বিক্রির সম্পূর্ণ উপযোগী হয়ে ওঠে। এক সপ্তাহ ধরে তিনি ক্ষেত থেকে তুলে লাউ বিক্রি করছেন।

স্থানীয় খুচরা বাজারে প্রতিটি লাউ আকারভেদে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

ক্ষেতে এসে সরাসরি সবজি কিনে নিচ্ছেন স্থানীয় সাধারণ ক্রেতারা; পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসায়ীরাও ক্ষেত থেকে পাইকারি দরে লাউ সংগ্রহ করে বিভিন্ন বাজারে পাঠাচ্ছেন।

হানিফ ভূইয়া জানান, এ পর্যন্ত তিনি চার হাজার টাকার বেশি লাউ বিক্রি সম্পন্ন করেছেন। মাচায় যে পরিমাণ কচি ফলন ঝুলছে, তাতে কোনো বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় না ঘটলে পরিবারের পারিবারিক চাহিদা পূরণের পর ৬০ হাজার টাকারও বেশি নগদ বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের মজবুত মাচাজুড়ে স্বাস্থ্যবান সবুজ লাউগাছের সমারোহ। লতায় লতায় ফুটে রয়েছে অজস্র সাদা ফুল, আর তার নিচেই সারিবদ্ধভাবে ঝুলছে উজ্জ্বল সবুজ রঙের অসংখ্য লাউ। ভালো ফলন ধরে রাখার জন্য সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একনিষ্ঠভাবে ক্ষেতের পরিচর্যায় সময় দিচ্ছেন এই কৃষক।

এলাকাবাসীর অভিমত, স্বল্প জমিতে সঠিক পরিকল্পনা ও শ্রম দিলে কীভাবে ভালো অর্থ উপার্জন করা যায়, হানিফের এই প্রচেষ্টা স্থানীয় কৃষকদের জন্য একটি বাস্তব দৃষ্টান্ত। তাঁর এই বিষমুক্ত চাষাবাদ দেখে এলাকার অন্য তরুণ ও সাধারণ কৃষকেরাও একই পদ্ধতিতে আবাদ করতে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মাসুদ রানা জানান, লাউ চাষে অন্যান্য ফসলের তুলনায় শারীরিক শ্রম তুলনামূলক কম লাগে এবং সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করলে অত্যন্ত ভালো ফলন নিশ্চিত করা যায়। আখাউড়ার কৃষকেরা অন্যান্য সবজির পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে মাচায় লাউ আবাদ করে ক্রমেই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, কৃষিতে একাগ্র চেষ্টা ও আধুনিক জৈব পরিচর্যা থাকলে যেকোনো চাষি সহজেই স্বাবলম্বী হতে পারেন এবং কৃষক আবু হানিফ ভূইয়ার এই উদ্যম তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক কৃষকদের সঙ্গে সমন্বয় রাখছেন এবং টেকসই জৈব কৃষির প্রসারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কারিগরি পরামর্শ প্রদান করছেন।