অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ১১:০৯ পিএম
ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণ ভেদাভেদ ভুলে সব ধর্মের মানুষকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সর্বাগ্রে মানুষ এবং বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করার সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, "এই দেশ আপনার, এই দেশ আমার। আমরা সকলে মিলে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশটিকে গড়ি।"
ধর্মীয় বিশ্বাসের পার্থক্য থাকলেও রাষ্ট্রীয় অধিকারের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবধান নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "ধর্মটা হতেই পারে আমার একটি ধর্ম, আপনার একটি ধর্ম। কিন্তু রাষ্ট্রটা আমাদের সকলের। বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্র, এই রাষ্ট্রটি আমাদের সকলের। এই দেশটিতে আপনার যেমন অধিকার আছে, আমারও অধিকার আছে। এই দেশের প্রতি আপনার যেমন কর্তব্য আছে, আমারও এই দেশের প্রতি কর্তব্য আছে।"
রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার পারস্পরিক দায়িত্ব ও নিরাপত্তার দিকটি জোরালোভাবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, "রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আপনাকে নিরাপত্তা দেওয়া, ঠিক একইভাবে এই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে আমাকেও নিরাপত্তা দেওয়া। আমাদের সকলের দায়িত্ব হচ্ছে আমরা একে অপরকে দেখে রাখব। আমরা একে অপরের সঙ্গে কাজ করে এ দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাব।"
নাগরিক ঐক্যের মূল ভিত্তি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, "আমরা সকলেই এই দেশের সন্তান, এই দেশের মানুষ, বাংলাদেশি। আমরা প্রত্যেকে মানুষ। এটি হচ্ছে আমাদের সবচেয়ে আগের পরিচয়। এখানে উপস্থিত আমরা প্রত্যেকেই বাংলাদেশি।"
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, "১৯৭১ সালে যখন মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধে যখন এই দেশের মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল স্বাধীনতার সূর্যকে ছিনিয়ে আনার জন্য, তখন কিন্তু আমরা কেউ দেখিনি কে মুসলমান, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ, কে খ্রিস্টান। যুদ্ধের মাঠে কিন্তু এটা আমরা দেখিনি, কখনো জিজ্ঞেসও করিনি।"
পরবর্তীতে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনগুলোতেও দেশের সর্বস্তরের মানুষের যৌথ আত্মত্যাগের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সময়ে গণতন্ত্র যখন হুমকির মুখে পড়েছিল এবং নাগরিকেরা তাদের মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে নেমে এসেছিলেন, তখনো কোনো আন্দোলনকারী কাউকে ধর্মীয় পরিচয় জিজ্ঞেস করেননি। সবাই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সোচ্চার ছিলেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সংঘটিত ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচারণ করে তারেক রহমান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, "বেশি দিন আগের কথা নয়। এই তো মাত্র আড়াই বছরও হয়নি বোধ হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। চোখটা বন্ধ করলেই আমাদের চোখের সামনে সবগুলো দৃশ্য ভেসে ওঠে। সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমে এসেছিল। কেউ কি আমরা কাউকে জিজ্ঞেস করেছি, ভাই আপনি কোন ধর্মের মানুষ?"
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সকল সম্প্রদায়ের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আজকেই তিনি ওসমানী উদ্যানে জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন করে এই অনুষ্ঠানে এসেছেন। সেই স্মৃতিস্তম্ভের শহীদদের তালিকায় হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান—সব ধর্মের মানুষ রয়েছেন, যারা দেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
দেশের সামগ্রিক অগ্রগতিতে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, "এই দেশটির যদি পরিবর্তন ঘটে, এ দেশের মানুষের যদি পরিবর্তন ঘটে, তাহলে আপনি যেমন উপকৃত হবেন, আমিও উপকৃত হব।"
তিনি আরও বলেন, মানুষের সুখ বা দুঃখের দিনে কোনো ধর্মীয় বিভাজন থাকে না; দুর্যোগে বা কল্যাণে সবাই কেবল মানুষ হিসেবেই পরস্পরের পাশে দাঁড়ায়। একে অপরকে নাগরিক হিসেবে সম্মান জানানোর মাধ্যমেই দেশ এগিয়ে যাবে।
শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভলগ্নে দেশের সমগ্র সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, "আজকে এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে একটি আনন্দের অনুষ্ঠান। আজকে এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে একটি মিলনমেলা।"

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন