সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,

চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৮:৫৮ পিএম

চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম নগর ও জেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে ভিন্নধর্মী শিল্পভাবনা ও সমকালীন থিমের মেলবন্ধনে উপচে পড়ছে দর্শনার্থীদের ভিড়। ধর্মীয় আচারের গণ্ডি ছাড়িয়ে আয়োজকেরা মণ্ডপসজ্জায় মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, সামাজিক অসংগতি, লোকজ ঐতিহ্য এবং গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে উত্তর কাট্টলী এলাকার ‘রিপু রজনী’ ও ‘অবিনশ্বর’ থিম দর্শনার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

উত্তর কাট্টলীর শ্রী শ্রী সেবা খোলা ও বৈকুণ্ঠধাম মন্দির পূজামণ্ডপে মহাষষ্ঠীর দিন থেকেই পুণ্যার্থীদের ভিড় সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন আয়োজক কমিটির সদস্যরা। প্রতিদিন দুপুর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মণ্ডপ প্রাঙ্গণে দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। কেবল মন্দির প্রাঙ্গণই নয়, দর্শনার্থীদের উপচে পড়া চাপের কারণে আশপাশের সড়কেও সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট। ভেতরে প্রবেশের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থেকেও মানুষের আগ্রহে ভাটা পড়েনি।

এই উৎসবমুখর আবহের মধ্যেই মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের রহমতগঞ্জের ঐতিহাসিক জে এম সেন হলের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের।

সফরকালে তিনি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শারদীয় শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করবেন।

মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ জানিয়েছেন, স্বাধীনতার পর এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো সরকারপ্রধান শারদীয় দুর্গোৎসবে চট্টগ্রাম সফরে এসে সরাসরি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এই আগমনকে ঘিরে বন্দরনগরীতে উৎসবের আমেজ ও উৎসাহ বহুগুণ বেড়ে গেছে। চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এবং বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মাঝে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রস্তুতি। পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলার পাশাপাশি বিভিন্ন দফতরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সমন্বয় বৈঠক।

সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় এবার সর্বমোট দুই হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব উদযাপিত হচ্ছে।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ২৯৪টি এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে দুই হাজার ৫৫৭টি মণ্ডপ। বিপুল এই আয়োজনের ভিড়ে থিমভিত্তিক মণ্ডপগুলো তাদের নির্মাণকুশলতা ও গভীর সামাজিক বার্তার কারণে আলাদা নজর কাড়ছে।

উত্তর কাট্টলী বাণী মন্দিরে এবার ৫৮তম দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদযাপন পরিষদ তাদের মণ্ডপের মূল ভাবনা রেখেছে ‘রিপু রজনী’। মানুষের ভেতরের কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য—এই ষড়রিপুর বিরুদ্ধে যে অবিরাম আধ্যাত্মিক যুদ্ধ, তা-ই এখানে শিল্পিত রূপ পেয়েছে। আয়োজকদের মতে, প্রবৃত্তির সাথে লড়াই করতে গিয়ে মানুষ কখনো জেতে, আবার কখনো নিজের ভেতরের অন্ধকারের কাছে হারে; অথচ সবচেয়ে কঠিন সংগ্রামটি যে নিজের সঙ্গেই করতে হয়, সেই আত্মশুদ্ধির শিক্ষাই এই থিমের প্রেরণা। এই আয়োজনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো মাটির বদলে মেটালের ব্যবহারের মাধ্যমে দেবী প্রতিমা নির্মাণ।

আয়োজকেরা জানান, এই অনন্য ভাবনার নেপথ্যে রয়েছেন অপটিমিস্টিক দে, আর নিখুঁত শৈলীতে প্রতিমার কারুকাজ সম্পন্ন করেছেন শিল্পী কার্তিক পাল। এর সঙ্গে ‘কৈলাশ লাইটিং’-এর চমৎকার ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম কুয়াশা এবং নীল লেজার আলোর প্রক্ষেপণ পুরো মণ্ডপ প্রাঙ্গণে এক অপার্থিব ও পরাবাস্তব আবহ সৃষ্টি করেছে।

পাশেই অবস্থিত উত্তর কাট্টলী কালীবাড়ির ‘অবিনশ্বর’ থিমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মহাকাল, মহাশ্মশান ও অঘোরী সাধনার আবহ। এই থিমের মাধ্যমে পার্থিব মোহমুক্তি এবং আত্মবিশ্লেষণের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির গভীর বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বাণী মন্দিরের সেবাখোলা ও বৈকুণ্ঠধাম পূজা উদযাপন পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা জুয়েল শীল বলেন, "আমরা সমসাময়িক শিল্প ও প্রযুক্তির মাধ্যমে একটি গভীর দার্শনিক বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছি।" তিনি জানান, চট্টগ্রাম নগর ছাড়াও দেশের নানা প্রান্ত এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বিপুল দর্শনার্থী ৫৮তম বার্ষিকীর এই ব্যতিক্রমী আয়োজন দেখতে আসছেন।

দর্শনার্থী সোমা দে জানান, সপ্তমীর রাতে টানা তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তবেই তিনি মণ্ডপে প্রবেশের সুযোগ পান। বর্তমানে এই মণ্ডপটির নিরাপত্তায় দুজন পুলিশ ও পাঁচজন আনসার সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন, যা বিপুল ভিড় সামাল দিতে অপ্রতুল হওয়ায় নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন।

সামাজিক ক্ষতের বিরুদ্ধেও সোচ্চার হয়েছে একাধিক মণ্ডপ।

নগরের খলিফা পট্টির পূজামণ্ডপে তুলে ধরা হয়েছে ‘রক্তাঞ্জলি’ থিম, যার মাধ্যমে সমাজে নারী ও কন্যাশিশুর ওপর চলমান নানামুখী নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রতিবাদের ভাষা নির্মাণ করা হয়েছে।

নগরের গোসাইলডাঙ্গা পূজামণ্ডপে ‘চড়ক পূজা’ থিমের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আবহমান বাংলার প্রাচীন লোকজ ঐতিহ্য ও উৎসব।

অন্যদিকে দক্ষিণ নালাপাড়ার ‘পার্বন’ থিমে দেবী দুর্গাকে উপস্থাপন করা হয়েছে আদিবাসী রূপে। এই মণ্ডপের ৭৫তম বর্ষপূর্তি ঘিরে ঐতিহ্যবাহী লোকজ সজ্জায় প্রায় ১৪ হাজার বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে। করুণাময়ী কালীবাড়ির ‘সাধুর দেশ’ থিমে সাধু-সন্ন্যাসীদের ত্যাগী জীবন ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ তুলে ধরা হয়েছে।

একইভাবে আন্দরকিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পুরোনো দিনের সংবাদপত্র, টাইপ ও ছাপাখানার নানা অনুষঙ্গ দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রকাশনা শিল্পের প্রাচীন ইতিহাস।

পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখতে আসা সুমন সিকদার নামের এক দর্শনার্থী জানান, এবারের থিমভিত্তিক পূজাগুলোতে শুধু সাজসজ্জার চাকচিক্য নয়, সমাজের নানা অসঙ্গতি ও বাস্তব বার্তা ফুটিয়ে তোলায় তা বিশেষ অর্থবহ হয়ে উঠেছে। পরিবার নিয়ে আসা দীপান্বিতা বিশ্বাস বলেন, প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি শিশুদের এসব সামাজিক ও দার্শনিক তাৎপর্য চেনানোর দারুণ সুযোগ মিলছে।

মহানগর পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ উল্লেখ করেন, দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, সৃজনশীল মনন ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য প্রকাশ। মণ্ডপগুলোতে সামাজিক দায়বদ্ধতা ও জনসচেতনতার এই মেলবন্ধন মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাবে।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা