সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,

সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম আর নেই

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৮:০৯ পিএম

সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম আর নেই

ছবি: সংগৃহীত

অসুস্থ স্ত্রীর মুখে খাবার তুলে দিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাকুল আকুতি জানিয়ে দেশজুড়ে আলোচনায় আসা অশীতিপর বৃদ্ধ সাজু শেখের স্ত্রী নূরজাহান বেগম (৭৫) আর নেই। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী অবস্থায় রোগযন্ত্রণার সঙ্গে লড়াই করার পর রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে শেরপুর সদর উপজেলার কামারিয়া ইউনিয়নের খুনুয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

ওই দিন বিকেল ৫টার দিকে স্থানীয় পারিবারিক কবরস্থানে নূরজাহান বেগমকে দাফন করা হয়।

তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সাজু শেখের ছয় দশকেরও বেশি সময়ের একনিষ্ঠ দাম্পত্য জীবনের অবসান ঘটল। জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে চরম একাকীত্ব ও অসহায়ত্বের মধ্যে পড়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ।

কামারিয়া ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় সদস্য ইলিয়াস মিয়া নূরজাহান বেগমের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, নূরজাহান বেগম দীর্ঘকাল ধরে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে ছিলেন। রোববার দুপুরে নিজ ঘরের বিছানাতেই তাঁর নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে অসাবধানতাবশত মাটিতে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহান বেগমের। সেই দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি স্বাভাবিক চলাফেরার সব ক্ষমতা হারিয়ে পুরোপুরি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।

অভাবের সংসারে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

বৃদ্ধ বয়সে নিজের শারীরিক অক্ষমতা সত্ত্বেও অসুস্থ স্ত্রীর সেবা-শুশ্রূষা, নিয়মিত পথ্য এবং প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হতো সাজু শেখকে।

দীর্ঘ প্রায় ৬৫ বছরের দাম্পত্য জীবনে এই দম্পতির ঘরে তিন মেয়ে ও তিন ছেলের জন্ম হয়। তিন মেয়েরই বিয়ে হয়ে গেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েদের কেউ কেউ মাঝেমধ্যে এসে বাবার খোঁজখবর নিতেন। তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনাভাইরাস মহামারির সময়ে বাড়ি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে যান, তবে তিনি মাঝেমধ্যে পরিবারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন। আরেক ছেলে রাজধানী ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে এক-দুবার বাড়িতে ফেরেন।

কিছুদিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি হৃদয়বিদারক ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সাজু শেখের নাম দেশজুড়ে মানুষের নজরে আসে।

সেই ভিডিওতে দেখা গিয়েছিল, চলচ্ছক্তিহীন স্ত্রীকে কোলে বসিয়ে সাজু শেখ কাতর কণ্ঠে বলছেন, "আল্লাহ, আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।" তাঁর এই অসহায় আর্তনাদ কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করে। ভিডিওটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলে বিভিন্ন সহমর্মী ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুনুয়া গ্রামে ছুটে গিয়ে তাঁদের জরুরি খাদ্য ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হয়।

সহায়তা মিললেও বার্ধক্য, রোগব্যাধি আর দারিদ্র্যের কঠোর বাস্তবতা থামেনি।

যে মানুষটির জীবন বাঁচাতে ও মুখে খাবার তুলে দিতে শেষ বয়সে এসে তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, সেই নূরজাহান বেগমকে হারিয়ে এখন সাজু শেখের জরাজীর্ণ বসতঘরে নেমে এসেছে আরও এক গভীর ও করুণ শূন্যতা।