অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম
স্বপ্নের নারীকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার তীব্র আশায় নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে প্রায় এক হাজার ৯৩১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছিলেন ব্রাজিলের ৪৯ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তিনি জানতে পারেন, যে নারীকে বিয়ে করতে গিয়েছিলেন বাস্তবে তাঁর কোনো অস্তিত্বই নেই। ওই কাল্পনিক নারী চরিত্রটি মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি দিয়ে নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল।
ভুক্তভোগী ব্যক্তির নাম এদিমার মার্টিন্স।
তিনি ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মারানিয়াও রাজ্যের একজন পেশাদার রাজমিস্ত্রি। স্থানীয় গণমাধ্যম টিভি মিরান্তেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্টিন্স জানান, ২০২০ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেসিকা অলিভেইরা নামের এক তরুণীর অ্যাকাউন্ট প্রথম তাঁর চোখে পড়ে। ভার্চুয়াল জগতে ওই নারী ‘জেসিকা ফাজেন্দেইরা’ নামেও ব্যাপক পরিচিত ছিলেন।
তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই অ্যাকাউন্টে তিন লাখের বেশি অনুসারী ছিল। সেখানে একটি সাজানো খামারবাড়িতে গ্রামীণ জীবনের মনোরম দৃশ্য তুলে ধরে নিয়মিত বিভিন্ন ভিডিওচিত্র প্রচার করা হতো। ভিডিওতে ওই নারী পুরুষ অনুসারীদের তাঁর খামারবাড়িতে এসে একসঙ্গে বসবাসের উদাত্ত আহ্বান জানাতেন এবং থাকার নিরাপদ জায়গা ও সার্বিক আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিতেন।
মায়ের মৃত্যুর পর দীর্ঘকাল ধরে তীব্র একাকিত্ব ও মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন মার্টিন্স।
তাঁর অন্তরে গভীর বিশ্বাস জন্মেছিল যে, ওই নারীকে কাছে পেলে নিঃসঙ্গ জীবনের ইতি টেনে নতুন করে সংসার শুরু করা সম্ভব হবে। অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত একটি নির্দিষ্ট ভিডিওতে ওই নারী চরিত্রটি তাঁকে সরাসরি আর্থিক অনুদান এবং নিজের খামারবাড়িতে বসবাসের লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছিল।
একপর্যায়ে ওই নারীর সঙ্গে সরাসরি দেখা করে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন মার্টিন্স।
তাঁকে নিজের সম্ভাব্য জীবনসঙ্গী মনে করে গত ৯ অক্টোবর নিজের ব্যবহৃত যাবতীয় আসবাবপত্র ও জিনিসপত্র বিক্রি করে তিনি দীর্ঘ যাত্রার খরচ জোগাড় করেন। এরপর ব্রাজিলের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় মিনাস জেরাইস রাজ্যের রাজধানী বেলো হরিজন্তের উদ্দেশে বাসে ওঠেন।
টানা এক দিনেরও বেশি সময় বাসে ভ্রমণ শেষে ১১ অক্টোবর বেলো হরিজন্তে শহরে পৌঁছান তিনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন ওই নারীর একাধিক রঙিন ছবি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে সাধারণ মানুষকে সেই ছবি দেখিয়ে পরিচয় জানতে চান তিনি। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউই ওই নারীকে শনাক্ত করতে পারেননি।
হন্যে হয়ে খোঁজার পর শেষ পর্যন্ত বেলো হরিজন্তের স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনের দ্বারস্থ হন মার্টিন্স।
সেখানেই পেশাদারদের অনুসন্ধানে তিনি জানতে পারেন, ওই নারীর বাস্তবে রক্তমাংসের কোনো অস্তিত্ব নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওই জনপ্রিয় অ্যাকাউন্টটি ছিল পুরোপুরি বানোয়াট। বিয়ের রঙিন স্বপ্ন দেখা নারীটি প্রকৃতপক্ষে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি মাত্র।
এমন চরম মানসিক আঘাতে গভীর হতাশা প্রকাশ করে মার্টিন্স বলেন, "এটি শুধু দুঃখ, হতাশা ও বিষণ্নতা নিয়ে আসে। অনেকেই একটি সম্পর্ক খুঁজছিলেন, তাই আমিও এসেছিলাম।"
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টটির নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি স্বীকার করেন যে, নারী চরিত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছিল। তবে মার্টিন্সের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি বার্তা আদান-প্রদানের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
ওই ব্যক্তির দাবি, চরিত্রটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি এবং কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ করেনি। অনলাইনে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রচার ও পণ্য বিক্রির উদ্দেশ্যে ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা বাড়াতেই এই রূপ তৈরি করা হয়েছিল। মার্টিন্সকে বেলো হরিজন্তে শহরে ডেকে নেওয়ার কথাও অস্বীকার করেন তিনি।
দীর্ঘ যাত্রাপথে নিজের শেষ সম্বলটুকুও খরচ করে ফেলায় সম্পূর্ণ অপরিচিত বেলো হরিজন্তে শহরে নিঃস্ব অবস্থায় আটকে পড়েন মার্টিন্স।
বাধ্য হয়ে তিনি স্থানীয় নগর কর্তৃপক্ষের কাছে বাঁচার আকুতি জানান। তাঁর দুরবস্থা দেখে সরকারি সমাজকর্মীরা এগিয়ে আসেন এবং তাঁকে খাবার, গোসলের সুযোগ ও শহর ছেড়ে নিজ ঠিকানায় ফেরার জন্য বিনামূল্যে একটি বাসের টিকিট দেন।
এত বড় নির্মম প্রতারণার শিকার হওয়ার পরও ভবিষ্যৎ জীবনে একজন সঙ্গিনী খুঁজে নেওয়ার আশা ত্যাগ করেননি এই রাজমিস্ত্রি। বর্তমানে এক আত্মীয়ের আশ্রয়ে অবস্থান করছেন তিনি। তিনি এখনো আশাবাদী যে, ভবিষ্যতে বেলো হরিজন্তে ফিরে গিয়ে এমন কোনো রক্তমাংসের মানুষের দেখা পাবেন, যাঁর সঙ্গে স্থায়ীভাবে ঘর বাঁধা যাবে।
নিজের প্রত্যয় ব্যক্ত করে মার্টিন্স বলেন, "আমি তাঁকে খুঁজে পাইনি। তবে অন্য কাউকে খুঁজে পাব। আমি যে জায়গায় গিয়েছিলাম, সেখানেই আবার যাব।"
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য সানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ছয় মাসেরও কম সময়ের মধ্যে মার্টিন্স হলেন তৃতীয় ব্যক্তি, যিনি বেলো হরিজন্তে শহরে এসে এমন এক কাল্পনিক নারীর সন্ধান করেছেন, যাকে পরবর্তীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নির্মিত চরিত্র হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি, নিউইয়র্ক পোস্ট ও দ্য সান

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন