অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৮:৪৩ পিএম
আবারও দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষা। গুরু-সান্নিধ্য লাভ আর আত্মশুদ্ধির মরমি সাধনায় একাত্ম হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা নিয়ে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের হাজারো সাধু, গুরু ও লালন অনুসারী। অধিবাস, বাল্য সেবা ও পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে রোববার (১৮ অক্টোবর) বিধিমোতাবেক সমাপ্ত হয়েছে মূল সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা।
পূর্ণ সেবা গ্রহণ শেষে বিদায়বেলায় ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সাঁইজির স্মৃতিবিজড়িত আখড়াবাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন সাধুরা। তবে আখড়াপ্রাঙ্গণের মূল মঞ্চে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা সোমবার (১৯ অক্টোবর) পর্যন্ত পুরোদমে চলবে।
বাউল সম্রাট ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের এই স্মরণোৎসবের দ্বিতীয় দিন থেকেই ভাঙতে শুরু করেছে সাধুদের মিলনমেলা। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, জাতপাতহীন অসাম্প্রদায়িক সমাজভাবনা এবং মরমি সাধনার চর্চায় সমবেত হওয়া সাধু ও ভক্তরা আনুষ্ঠানিক আচার শেষ করে নিজ নিজ ঠিকানায় ফিরে যাচ্ছেন।
রেখে যাচ্ছেন আবারও ফিরে আসার গভীর প্রত্যাশা।
সফরসূচি ও ভক্তদের বর্ণনানুযায়ী, রোববার সকালে বাল্য সেবা এবং দুপুরে পূর্ণ সেবা পরিবেশন করা হয়। এর মধ্য দিয়েই ঐতিহ্যবাহী সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। এরপর বিকেল থেকেই অধিকাংশ সাধু আখড়াবাড়ি ছেড়ে রওয়ানা দেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগত গুরুকার্য সম্পন্ন করে সোমবার সকালে বিদায় নেবেন বলে জানা গেছে।
গাইবান্ধা থেকে আসা নিজাম ফকির বলেন, "আমরা প্রতিবছর সাঁইজির ধামে আসি। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-গুরুরা একত্রিত হয়ে সাধুসঙ্গ করি। অধিবাস, রাখাল সেবা, বাল্য সেবা ও পূর্ণ সেবার মধ্যদিয়ে আমাদের সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে সাঁইজির আখড়াবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আবারও আগামী বছর আসব। এই মিলন মেলায় সবার সঙ্গে দেখা হবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।"
আরেক সাধু মামুন বলেন, "সাঁইজির ধামে এলে আমরা সবাই এক পরিবারের মতো মিলিত হই। সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে গুরু-সান্নিধ্য লাভ করি এবং লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন ও মরমি ভাবধারার চর্চা করি। পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় এখন বিদায়ের পালা। মনটা খুব ভারী হয়ে আছে। আবারও আগামী বছর সাঁইজির ধামে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকব।"
মরমি এই পরিমণ্ডলে জ্ঞানতৃষ্ণা নিয়ে ছুটে এসেছেন নবীন শিক্ষার্থীরাও।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক নারী শিক্ষার্থী জানান, এখানে আসার মূল উদ্দেশ্য লালন সাঁইয়ের দার্শনিক ভাবনা সম্পর্কে জানা ও তা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করা। বিশেষ করে সমাজের বৈষম্যবিরোধী যে অমোঘ বার্তা তিনি দিয়ে গেছেন, তা তরুণ প্রজন্মকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করে। তাঁর দর্শন ও চিন্তাধারা কাছ থেকে অনুভব করা এবং বোঝার সুযোগ অত্যন্ত মূল্যবান। লালনের বাণীর মতোই তাঁর গানগুলোও চেতনার গভীরে দাগ কাটে। এই আয়োজন থেকে সমবেত দর্শনার্থীরা মানবতা, সাম্য ও ইতিবাচক চিন্তার শক্তিশালী বার্তা নিয়ে ফিরছেন।
সাধুদের আনুষ্ঠানিক বিদায়ে আখড়াবাড়ির ভেতরকার সাধুসঙ্গ সমাপ্ত হলেও উৎসবের সামগ্রিক আমেজ এখনো অমলিন রয়েছে।
মূল মঞ্চে লালন অ্যাকাডেমির শিল্পী এবং দেশবরেণ্য বিশিষ্ট লালন কণ্ঠশিল্পীদের পরিবেশনায় গভীর রাত পর্যন্ত পরিবেশিত হচ্ছে মরমি গান। পাশাপাশি আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে চলমান তিন দিনের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ মেলাও সোমবার পর্যন্ত জমজমাট থাকবে। ফলে সাধুদের একটি বড় অংশ ফিরে গেলেও সাধারণ লালন অনুরাগী, বাউল ও সাধারণ দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর রয়েছে ছেঁউড়িয়া।
দর্শনার্থীদের কেউ লালনের সর্বজনীন দর্শন জানতে, কেউ মানবতাবাদী দর্শনে জীবনের অর্থ খুঁজতে, আবার কেউ আত্মিক প্রশান্তির অন্বেষণে ছুটে এসেছেন এই লোকতীর্থে।
বাউল সাধকদের এই সমাবেশ সুশৃঙ্খল ও শান্তিপূর্ণ রাখতে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে নেওয়া হয় কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তাবলয়।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান জানান, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস নিছক একটি স্মরণোৎসব নয়, বরং এটি তাঁর মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সর্বজনীন সম্প্রীতির বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য আয়োজন। এ উৎসবে দেশ-বিদেশের লালনভক্ত, সাধু-গুরু ও সাধারণ দর্শনার্থীরা সমবেত হয়েছেন।
উৎসবকে শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন রাখতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী সমন্বিতভাবে সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় রেখেছে। দর্শনার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঐতিহাসিক পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রশাসন সদা সতর্ক রয়েছে। লালনের দর্শন ও আবহমান বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে এ ধরনের আয়োজন সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক আধ্যাত্মিক সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের প্রয়াণের পর থেকেই তাঁর অনুসারী ও ভক্তরা ছেঁউড়িয়ায় এই স্মরণানুষ্ঠান পালন করে আসছেন। কালক্রমে লালন অ্যাকাডেমি ও স্থানীয় প্রশাসনের সরাসরি ব্যবস্থাপনায় এই স্মরণোৎসব জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে। প্রতিবছর কার্তিকের এই পুণ্যলগ্নে লালনের প্রেম, মানবকল্যাণ ও আত্মশুদ্ধির চিরন্তন টানে দেশ-বিদেশের অসংখ্য সাধক ও মুক্তিকামী মানুষ ছেঁউড়িয়ার ধামে সমবেত হন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন