সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬,

অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা দেখতে ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ভক্তদের ভিড়

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৯:১৮ পিএম

অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা দেখতে ধামরাইয়ের বণিকবাড়িতে ভক্তদের ভিড়

ছবি: সংগৃহীত

শারদীয় দুর্গাপূজা শেষে জলকেলির মধ্য দিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়াই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের চিরায়ত রীতি। তবে ঢাকার ধামরাইয়ের ঐতিহাসিক বণিকবাড়িতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পালিত হচ্ছে এর ব্যতিক্রমী এক প্রথা। সেখানে প্রায় ৫২০ কেজি ওজনের বিশালাকার অষ্টধাতুর দুর্গাপ্রতিমা কখনোই বিসর্জন দেওয়া হয় না। প্রতিমা জলে নিমজ্জিত করার বদলে প্রতীকী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় পাঁচ দিনব্যাপী পূজার যাবতীয় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা।

আট ফুট উচ্চতার এই দৃষ্টিনন্দন প্রতিমাটি ২০১৭ সালে তৈরি করা হয়।

নির্মাণে সময় লেগেছিল প্রায় এক বছর, আর সে সময় ব্যয় হয়েছিল প্রায় ২৫ লাখ টাকা। প্রতিবছর শারদীয় দুর্গোৎসবে ধাতুশিল্পের এই চোখধাঁধানো শিল্পকর্ম একনজর দেখতে দেশের নানা প্রান্ত থেকে বণিকবাড়িতে ভিড় জমান ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে হাজারো দর্শনার্থী।

শাস্ত্রীয় রীতি মেনে প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে আটটি বিশেষ ধাতু—স্বর্ণ, রুপা, পারদ, দস্তা, সীসা, লোহা, রাং ও তামা। দেবী দুর্গার মূল কাঠামোর পাশাপাশি একই ধাতব আদলে গড়া হয়েছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশের মূর্তি। প্রতিমার অবয়ব, রূপের সুষম গড়ন এবং চোখের শৈল্পিক অলংকরণে অনুসরণ করা হয়েছে প্রাচীন বাংলার লোকজ রীতি। প্রতিমার চোখগুলো বাঁশপাতার নিখুঁত আদলে খোদাই করা হয়েছে।

বণিকবাড়ির বর্তমান স্বত্বাধিকারী সুকান্ত বণিক জানান, তাঁদের পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই পরম মমতায় এই প্রতিমা তৈরি করেছেন।

প্রায় দুই শতক ধরে এই পরিবারটি তামা, কাঁসা ও পিতলের নানা ঐতিহ্যবাহী কারুপণ্য তৈরির প্রাচীন পেশার সঙ্গে জড়িত। সুকান্ত বণিক বলেন, "আগে মাটির প্রতিমা তৈরি করে পূজা হতো। পরিবারের সদস্য কমে যাওয়ায় স্থায়ী একটি প্রতিমা তৈরির চিন্তা আসে। পরে আমরা নিজেরাই এটি তৈরি করি।"

তিনি আরও জানান, প্রতিমাটি সম্পূর্ণভাবে তাঁদের নিজস্ব পারিবারিক পূজা-অর্চনার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে, এটি বিক্রির জন্য নয়। তবে কেউ ব্যক্তিগতভাবে অর্ডার দিলে এমন প্রতিমা তৈরি করে দেওয়া সম্ভব, যদিও কাজটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় দীর্ঘ সময়ের প্রস্তুতির দরকার হয়।

ধামরাইয়ের কায়স্থপাড়ার বণিকবাড়িতে দুর্গাপূজার ইতিহাস প্রায় ১২৬ বছরের প্রাচীন।

একসময় এখানে প্রতিবছর নতুন করে মাটির প্রতিমা গড়ে পূজার আয়োজন করা হতো। কালক্রমে যৌথ পরিবারের লোকবল কমে যাওয়ায় প্রতিবছর মাটি দিয়ে প্রতিমা তৈরির ঝামেলা এড়াতে স্থায়ী প্রতিমা নির্মাণের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে অষ্টধাতুর প্রতিমাটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর মহাষষ্ঠীর আগে এটিকে বিশেষ রাসায়নিক ও পলিশের মাধ্যমে নতুন রূপ দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়।

পূজার নির্ধারিত পাঁচ দিন সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য বণিকবাড়ির সদর দরজা ও পূজামণ্ডপ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা হয়।

চোখজুড়ানো প্রতিমা দেখার পাশাপাশি দর্শনার্থীদের বাড়তি আকর্ষণ জোগায় বণিকবাড়ির শতাব্দীপ্রাচীন স্থাপত্যশৈলী, দেওয়ালের কারুকাজ এবং পরিবারটির সংগ্রহে থাকা তামা-পিতল-কাঁসার প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। বাড়ির বিভিন্ন প্রাঙ্গণে শোভা পাচ্ছে নৃত্যরত নটরাজসহ বহু দেবদেবীর ধাতব ভাস্কর্য।

সাভারের রেডিও কলোনি এলাকা থেকে এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা দেখতে ছুটে এসেছিলেন দর্শনার্থী খালিদ হোসেন ও তাঁর বন্ধু দীপঙ্কর দাস। পরিচিতজনদের কাছ থেকে এমন ভিন্নধর্মী প্রতিমার কথা শুনে তাঁরা সশরীরে এই শিল্পকর্ম প্রত্যক্ষ করতে আসেন। মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া থেকে আসা দর্শনার্থী বৃষ্টি সরকার জানান, সচরাচর সব পূজামণ্ডপে মাটির প্রতিমা দেখেই অভ্যস্ত সবাই, কিন্তু এখানে ধাতু দিয়ে তৈরি এমন মহিমান্বিত প্রতিমা দেখতে পেয়ে এক অন্যরকম অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে।

সুকান্ত বণিক জানান, স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন জেলার দর্শনার্থীদের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটক এবং ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের কূটনীতিকেরাও এই মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ধামরাইয়ের এই অষ্টধাতুর প্রতিমা নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

পূজা শেষ হলেও এই প্রতিমার বিসর্জন ঘটে না। আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতিমাটি বণিকবাড়ির নির্ধারিত বেদিতেই পরম যত্নে সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রতীকী দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিদায় জানান দেবী দুর্গাকে।