রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,
উচ্চমূল্যের ফল ও কৃষিব্যবস্থাপনা

আনারকলি ও ড্রাগন চাষে কৃষকদের নতুন আশা: সংকট উত্তরণে রূপরেখা ঘোষণা

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১২:২৯ পিএম

আনারকলি ও ড্রাগন চাষে কৃষকদের নতুন আশা: সংকট উত্তরণে রূপরেখা ঘোষণা

দেশে উচ্চমূল্যের ফল ও অসময়ের সবজি আবাদে বহুমুখী সম্ভাবনা তৈরি হলেও অতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার, রোগবালাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাবে সংকটে পড়েছেন সাধারণ চাষিরা। সুরক্ষিত ছাউনিতে সবজি উৎপাদন এবং আনারকলি ও ড্রাগনসহ নানা দামি ফলের আবাদ সম্প্রসারণে কৃষিবান্ধব সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন প্রবীণ চাষি ও সংগঠক হারুনুর রশিদ মুসা।

অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে ৩৩ শতাংশ জমির ওপর সরকারি সহায়তায় পলি হাউস তৈরি করা হয়েছে।

এই সুরক্ষিত ছাউনির ভেতর মূলত অসময়ের উচ্চমূল্যের সবজি যেমন গ্রীষ্মকালীন টমেটো, আগাম জাতের ক্যাপসিকাম ও গাজর আবাদ করা হচ্ছে। বর্ষাকালে খোলা মাঠে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে সবজি নষ্ট হয়ে যায়। তবে নিয়ন্ত্রিত আচ্ছাদনের কারণে বৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা পেয়ে ফসল স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠে। ফলে অসময়ে ফসল বাজারে তুলে চাষিরা সাধারণ মৌসুমের চেয়ে অনেক বেশি দাম পান।

পাকা ফল পাখির উপদ্রব থেকে রক্ষা করতে ড্রাগন বাগানে বিশেষ জাল ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ড্রাগন আবাদে এক ধরনের দীর্ঘস্থায়ী মন্দা দেখা দিয়েছে। এই চাষে অতিরিক্ত মাত্রায় রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে গাছের স্বাভাবিক আয়ু কমে গেছে এবং কাণ্ডে বিভিন্ন জটিল রোগবালাই বাসা বেঁধেছে। রোগাক্রান্ত ফল বাজারজাত করা সম্ভব হয় না। এর পাশাপাশি ফলে মাত্রাতিরিক্ত কৃত্রিম হরমোন প্রয়োগের কারণে ভোক্তারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

আগে যেখানে প্রতি কেজি ড্রাগন ফল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হতো, সেখানে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেও উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক বড় উদ্যোক্তাও বাগান গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। সংকট নিরসনে ক্ষতিকর হরমোনের ব্যবহার বন্ধে সরকারি নজরদারি এবং রোগবালাই নিরাময়ে কৃষি বিজ্ঞানীদের মাঠপর্যায়ের গবেষণা এখন সময়ের দাবি।

মাঠপর্যায়ে আনারকলি, অ্যাভোকাডো ও ড্রাগন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।

এর পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে বারোমাসি কাঁঠাল, আবিয়ু, রামবুটান ও লঙ্গানের মতো বিদেশি ফল আবাদ শুরু করেছেন এই উদ্যোক্তা। এসব উচ্চমূল্যের ফল উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও বিনিয়োগের প্রয়োজন হওয়ায় লিজ নেওয়া জমিতে ঝুঁকি না নিয়ে নিজস্ব জমিতেই তা চাষ করছেন তিনি।

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই দেশের ৬৪ জেলা ভ্রমণ এবং শিক্ষাজীবন শেষে বিশ্বের ১১টি দেশ ঘুরে কৃষির আধুনিক কলাকৌশল পর্যবেক্ষণ করেছেন হারুনুর রশিদ মুসা। তিনি দেখতে পান, অনেক দেশ কৃষিনির্ভর না হলেও সেখানে উচ্চশিক্ষিত তরুণরা আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় সফল উদ্যোক্তা হচ্ছেন।

প্রান্তিক চাষিদের ন্যায্য অধিকার সুরক্ষায় ২০২২ সালে তিনি বাংলাদেশ ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশন নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন। দেশকে কৃষিতে এগিয়ে নিতে দীর্ঘ ও মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা হিসেবে তিনি সরকারের কাছে ২৮টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তুলে ধরেছেন।

বিদ্যমান কৃষি ব্যাংক থেকে শর্তের জটিলতার কারণে প্রান্তিক চাষি ও কৃষি স্নাতকরা ঋণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

এই সংকট নিরসনে তিনি ‍‍`কৃষক ব্যাংক‍‍` প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন। সেখানে নির্ধারিত কৃষি আইডি কার্ডধারী প্রকৃত কৃষক ছাড়া কোনো ব্যবসায়ী বা সংস্থাকে ঋণ না দেওয়ার পক্ষে মত দেওয়া হয়।

দেশে খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষক পর্যায়ে পর্যাপ্ত জৈব সার উৎপাদন প্রদর্শনীর খামার গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। রাসায়নিক সার আমদানিতে সরকারকে বিপুল অঙ্কের ভর্তুকি গুনতে হয়। কৃষক নিজস্ব খামারে উৎপাদিত জৈব সার জমিতে প্রয়োগ করলে মাটির উর্বরতা ও পরিবেশ রক্ষা পাবে, বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত হবে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।