অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৯:১২ পিএম
রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে ধলেশ্বরী নদীবিধৌত ধামরাই উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি ও উর্বর মাটির মেলবন্ধনে শাকসবজি চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। উপজেলার রোয়াইল ইউনিয়নের চর সুঙ্গর ও চর বড়দাইলসহ আশপাশের সাড়ে চারশর বেশি গ্রামে দিগন্ত বিস্তৃত প্রান্তরে এখন কেবলই চোখ জুড়ানো সবুজ শাকসবজির সমারোহ। চাষযোগ্য উর্বর পলিমাটি, কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির যথাযথ সমন্বয়ে এ অঞ্চলের গ্রামীণ অর্থনীতি সম্পূর্ণ কৃষিনির্ভর হয়ে উঠেছে। রোয়াইল ইউনিয়নে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ দুই হাজার ১০০ হেক্টরেরও বেশি। এই বিপুল আবাদি জমির দুই-তৃতীয়াংশই তিন ফসলি জমি, যার সিংহভাগ অংশেই বছরজুড়ে বাণিজ্যিকভাবে নানা পদের শাকসবজি চাষ করা হচ্ছে।
জমির প্রস্তুতি থেকে শুরু করে বীজ বপন ও চারা রোপণের প্রতিটি পর্যায়ে আধুনিক সরঞ্জামের ব্যবহার এখানকার কৃষিকাজকে গতিশীল করেছে।
পাওয়ার টিলার দিয়ে জমি চাষের পাশাপাশি বীজ বপনের ক্ষেত্রে সমান্তরাল রেখা টানতে স্থানীয় কৃষকেরা দাঁতে আঙুল নামের ঐতিহ্যবাহী কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর দাগানি যন্ত্র ব্যবহার করছেন। এই দাগানি যন্ত্রের রেখা বরাবর বীজ রোপণ করায় জমিতে সেচ প্রদান, সুষম সার প্রয়োগ ও আগাছা দমন অত্যন্ত সহজ হয়, যা সময় ও উৎপাদন খরচ দুটোই উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেয়। ধামরাইয়ের আবাদি জমিতে পলিযুক্ত দোআঁশ ও বেলে-দোআঁশ মাটির প্রাধান্য থাকায় শাকসবজি ফলানোর পরিবেশ এখানে প্রাকৃতিকভাবেই সমৃদ্ধ।
বেগুন ও টমেটোর আধুনিক আবাদে কৃষকেরা পরিমিত দূরত্বের নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলছেন।
বীজতলায় বেগুনের বীজ বপনের ৩০ থেকে ৪০ দিন পর চার থেকে ছয়টি পাতা বের হলে চারাগুলো মূল জমিতে রোপণের উপযোগী হয়। মাঠে বড় জাতের বেগুনের চারা সাধারণত ৬০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার দূরত্বে এবং ছোট জাতের চারা ৫০ থেকে ৭৫ সেন্টিমিটার দূরত্বে রোপণ করা হয়। চারাগুলো সতেজ রাখতে সাধারণত বিকেলের রোদের তীব্রতা কমলে জমিতে রোপণ সম্পন্ন করেন কৃষকেরা। একইভাবে টমেটোর চারা রোপণের ক্ষেত্রে বীজতলায় চারাটি যতটা গভীরে ছিল, মূল জমিতেও ঠিক সমপরিমাণ গভীরতা বজায় রাখা হয়।
পুরো ধামরাই অঞ্চলে চাষাবাদে সবচেয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে পরিবেশবান্ধব মালচিং পেপারের ব্যবহার।
বিশেষ ধরনের পলিথিন শিট দিয়ে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা এবং আগাছা ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকানোর এই প্রক্রিয়ায় রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমেছে। কৃষকেরা জানিয়েছেন, সনাতন পদ্ধতির চেয়ে মালচিং পদ্ধতিতে টমেটো ও বেগুনের ফলন ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হচ্ছে।
লতানো সবজি চাষের ক্ষেত্রে বাঁশের খুঁটি, তার ও নাইলনের সুতা দিয়ে তৈরি ইংরেজি বর্ণ এ আকৃতির দুই দিকে হেলানো বিশেষ মাচা বা বাউনি পদ্ধতি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছে। ঝুলন্ত অবস্থায় পর্যাপ্ত আলো-বাতাস পেয়ে প্রতিটি সবজি যেমন দাগমুক্ত ও সুষম পুষ্ট হয়, তেমনি রোগবালাইয়ের প্রকোপও কমে যায়। এই হেলানো মাচায় শসা চাষ করে মাত্র ৪৫ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে জাতভেদে ১০০ থেকে ৩০০ কেজি পর্যন্ত ফলন সংগ্রহ করছেন কৃষকেরা।
একইভাবে লতানো লাউগাছে ফুল ফোটার পর ৫০ থেকে ৭০ দিনের মাথায় ফসল তোলা যায়, যা এখন রবি, খরিফ ও জায়েদ—এই তিন মৌসুমেই সমানভাবে উৎপাদিত হচ্ছে।
ধামরাইয়ের মাঠজুড়ে পেঁপে চাষেও বিপুল বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। এখানে উন্নত জাতের শাহী, সুইট লেডি, অম্বর লেডি, টপ লেডি, রেড লেডি, ব্লু স্টেম, রাঁচি, যশোহরি ও কাশিমপুরী জাতের পেঁপে বাণিজ্যিকভাবে আবাদ হচ্ছে।
পটল গাছে ফুল আসার মাত্র ১০ থেকে ১২ দিন পর থেকেই খাবার উপযোগী পটল সংগ্রহ করা যায় এবং প্রতিটি গাছে গড়ে অন্তত সাড়ে তিনশ পটল ধরে। ঝাল মরিচের ক্ষেত্রে রবি ও খরিফ উভয় মৌসুমে চাষ হলেও রবি মৌসুমে ফলন সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। এছাড়া আট থেকে ১০ সেন্টিমিটার লম্বা হতেই কচি ঢ্যাঁড়শ মাঠ থেকে আহরণ করা হয়।
রোয়াইল ইউনিয়নের ১৫টি গ্রামে পাঁচ হাজারের বেশি পরিবারের বাস, যার মধ্যে পৌনে তিনশ পরিবার বাদে প্রায় সবাই প্রত্যক্ষভাবে কৃষিকাজে যুক্ত।
কৃষিজমির পাশাপাশি ধলেশ্বরীর বিল ও জলাশয় থেকেও সংগ্রহ করা হয় প্রাকৃতিক শাপলা, কলমিলতা, হেলেঞ্চা, মালঞ্চ, কুলেখাড়া ও সুষনি শাক, যা স্থানীয় বাজারে সবজি হিসেবে বেশ চাহিদাসম্পন্ন।
বীজ বপনের মাত্র ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে লালশাক এবং ৪০ থেকে ৪৫ দিনের মাথায় পুইশাক বাজারজাত করা যায়। সোনালী আঁশের বদলে কেবল তরতাজা শাকের জোগান দিতেই এখানকার চাষিরা বিশেষ জাতের পাট চাষ করে থাকেন। অনুকূল আবহাওয়ায় ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের মধ্যেই মাঠ থেকে সংগ্রহ করা হয় আগাম ও শীতকালীন মূলা, যা কৃষকদের দ্রুততম সময়ে নগদ অর্থের সংস্থান করে দেয়।
মাঠ থেকে সবজি আহরণ ও বাছাইয়ের পর তা পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয় সাধারণের চেয়ে বড় ও ছড়ানো বিশেষ আকারের ঐতিহ্যবাহী ঝাঁকা।
ধামরাইয়ের চর সুঙ্গর গ্রাম থেকে প্রায় আট কিলোমিটার পূর্বে ধলেশ্বরী নদীর জলপথে সাভারের নামাবাজার ঘাট অবস্থিত। নদীপথে সাশ্রয়ী নৌকা ও ট্রলারে করে প্রতিদিন শত শত ঝাঁকা তাজা সবজি এই মোকামে এসে পৌঁছায়। নামাবাজার ঘাটের মাত্র আড়াইশ মিটার পূর্বে অবস্থিত নামাবাজার পাইকারি আড়ত, যেখানে প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে শুরু হয়ে সকাল আটটা থেকে নয়টার মধ্যেই সম্পন্ন হয় পাইকারি বেচাকেনা।
ধামরাই ছাড়াও সিংগাইর ও সাভারের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা নিজস্ব পণ্য নিয়ে এই মোকামে সমবেত হন।
লাউ, পেঁপে, মিষ্টি পটল, শসা, ঢ্যাঁড়শ, মরিচ, কাঁচকলা, থোর, মোচা এবং চালতা থেকে শুরু করে নানা জাতের মৌসুমি ফল এখানে পাইকারি দরে বিক্রি হয়। ভাদ্র থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত নামাবাজারে প্রচুর পরিমাণে জাম্বুরা ওঠে।
প্রতিদিন ভোরে এই মোকামে কয়েক লাখ টাকার কৃষিপণ্য হাতবদল হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় সাভারের নামাবাজার থেকে এসব সবজি প্রতিদিন দ্রুতগতির যানবাহনে রাজধানী ঢাকাসহ গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন প্রধান কাঁচাবাজারে পৌঁছে যায়, যা দেশের সার্বিক খাদ্য সরবরাহ ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন