অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৫:৪০ পিএম
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব, নদীতে অস্বাভাবিক লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মানসম্মত রোগমুক্ত পোনার তীব্র সংকটে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বাগদা চিংড়ি চাষ।
অতীতে ঘেরে ছাড়া পোনার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত মাছ আহরণ করা সম্ভব হলেও এখন তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে মাত্র ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। উপকূলের ঐতিহ্যবাহী এই সাদা সোনা উৎপাদনে ধস নামায় চরম ক্ষতির মুখে পড়ছেন খামারিরা।
খুলনার পাইকগাছা ও কয়রা অঞ্চলে দীর্ঘ দুই দশক ধরে এই মৎস্য খাতের সাথে যুক্ত রয়েছেন জাতীয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত চিংড়ি চাষি গোলাম কিবরিয়া রিপন। পাইকগাছায় ছয়টি পৃথক ঘেরে তার প্রায় এক হাজার ১০০ বিঘা জমি রয়েছে, যার বেশিরভাগই লিজ নেওয়া। এছাড়া কয়রা মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার বিঘা ঘেরে তিনি পরিবেশবান্ধব ও প্রাকৃতিক উপায়ে বাগদা এবং অন্যান্য লবণসহিষ্ণু মাছের চাষ করছেন। এই প্রকল্পে স্থায়ীভাবে ৭৫ থেকে ৮০ জন শ্রমিক কাজ করেন এবং ঘের প্রস্তুতের মৌসুমে প্রায় চার থেকে পাঁচশ দিনমজুরের কর্মসংস্থান হয়।
উৎপাদন ব্যবস্থা মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে জানান এই খামারি।
আগে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক পরিবেশে যে হারে বাগদা উৎপাদন হতো, এখন ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে তা আর সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে মে ও জুন মাসে পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নদীর লবণাক্ততা মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পায়। বাগদা চিংড়ি সাধারণত আট থেকে বারো মাত্রার লবণাক্ত পানিতে ভালো বাড়ে, অথচ শুষ্ক মৌসুমে তা বেড়ে ২৫ মাত্রায় পৌঁছে যায়। এর ফলে ঘেরের প্রাকৃতিক প্লাঙ্কটন নষ্ট হয়ে খাদ্য সংকট তৈরি হয় এবং বিভিন্ন অজানা রোগে চিংড়ি মারা যায়।
বর্তমানে হ্যাচারিগুলো থেকে যে পোনা সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেগুলোর রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতা বা এসপিএফ মান নিশ্চিত নয়। মানহীন পোনা কিনে প্রান্তিক চাষিরা বারবার প্রতারিত হচ্ছেন।
ঘেরে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে প্লাঙ্কটন তৈরি করে ব্ল্যাক টাইগার জাতের বাগদা চাষ করা হয়। কোনো ধরনের রাসায়নিক বা প্রোবায়োটিক ছাড়া উৎপাদিত এই চিংড়ির আকার মানভেদে বিভিন্ন রকম হয়। বর্তমানে ২০ থেকে ২২টিতে কেজি হয় এমন প্রতিটি ৫০ গ্রাম ওজনের বড় বাগদা স্থানীয় আড়তে বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকায়। প্রতিটি ৩০ থেকে ৩৫ গ্রাম ওজনের মাঝারি আকারের বাগদা বিক্রি হচ্ছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকায়। এছাড়া নদীর জোয়ারের পানির সাথে আসা হরিণা চিংড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৭০০ টাকা কেজি দরে।
আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের সুনাম ক্ষুণ্নকারী মধ্যস্বত্বভোগীদের জেলি পুশ প্রতারণা নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী খামার থেকে মাছ কেনার পর ওজন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অস্বাস্থ্যকর জেলি বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ চিংড়ির ভেতরে পুশ করে। এই অপদ্রব্যের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং ভোক্তাদের স্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। গরম পানির সংস্পর্শে আনলে বা কাটার সময় এই সাদা কৃত্রিম জেলি চিহ্নিত করা যায়। এই প্রতারণা বন্ধে সরকারি তদারকি কঠোর করার দাবি জানান তিনি।
বছরে প্রায় ৮৫ টন চিংড়ি উৎপাদন সক্ষমতা এবং সাড়ে চার কোটি টাকার বার্ষিক লেনদেন থাকলেও ঝুঁকি এখন চরমে। বছরে চার থেকে পাঁচ ধাপে পোনা ছাড়া হলেও অনেক সময় ভাইরাস ও দুর্যোগে তিন ধাপেই সব মাছ মরে নিঃস্ব হতে হয়।
প্রান্তিক চাষিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মাটি-পানি নিয়মিত পরীক্ষা এবং রোগ নির্ণয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন