অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৫:৩৩ পিএম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এগিয়ে নেওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বাণিজ্যিক সুবিধা সম্প্রসারণে নেদারল্যান্ডসের কার্যকর সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ।
একই সঙ্গে কৃষি, পাটশিল্প, জ্বালানি, বন্দর অবকাঠামো ও আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনায় ডাচ প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কাজে লাগিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে নেদারল্যান্ডসের বৈদেশিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতাবিষয়ক মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমার সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব বিষয় তুলে ধরেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের পক্ষ থেকেও কৃষি ও শিল্পপ্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর অবকাঠামো এবং পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা সম্প্রসারণে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উল্লেখ করেন, নেদারল্যান্ডস বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অন্যতম শীর্ষ উন্নয়ন সহযোগী। দুই দেশের মধ্যকার কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ককে কেবল প্রচলিত পণ্য কেনাবেচার গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, ভারী শিল্পায়ন, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে আরও সুসংহত অংশীদারত্বে রূপ দেওয়ার বিরাট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল উৎপাদন সক্ষমতা ও সম্ভাবনাময় অভ্যন্তরীণ বাজারের সাথে ডাচ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন ঘটানো গেলে উভয় দেশই সমানভাবে লাভবান হবে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো বাংলাদেশের প্রধানতম রপ্তানি গন্তব্য হওয়ায় এই বিশাল বাজারে দীর্ঘমেয়াদি শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ লক্ষ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত সহযোগিতা জোরদারের পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারিগরি আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং বিভিন্ন শুল্কবহির্ভূত বাণিজ্য বাধা দূরীকরণে ডাচ সরকারের সক্রিয় সমর্থন চান তিনি।
দুই দেশের নীতিনির্ধারকদের আলোচনায় কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ খাতে কৌশলগত অংশীদারত্বের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। নেদারল্যান্ডসের উন্নত বীজপ্রযুক্তি, আধুনিক কৃষি গবেষণা এবং ফলন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কৃষি খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে বলে মন্তব্য করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। বিশেষ করে আলু ও অন্যান্য উচ্চমূল্যের সবজির গুণগত মান উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে রপ্তানিযোগ্য কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং নতুন বৈশ্বিক বাজার সন্ধানে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। এ সময় তিনি সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় ভৌগোলিক অঞ্চলে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক সবজি চাষ সম্প্রসারণ, প্রান্তিক চাষিদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক শীতাতপ সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের বৈশ্বিক চাহিদার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের পাটশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বৈঠকে বিস্তারিতভাবে আলোচনায় আসে। মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক বর্জনের ফলে প্রাকৃতিক পাট ও বহুমুখী পাটপণ্যের সামনে নতুন রফতানি দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে। উচ্চফলনশীল পাটবীজ উদ্ভাবন, মাঠপর্যায়ে উৎপাদন বৃদ্ধি, যৌথ আধুনিক গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনে ডাচ প্রযুক্তিগত সহায়তা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব টেকসই প্যাকেজিং ও পাট-তুলার মিশ্র তন্তুর আধুনিক কাপড় তৈরির মাধ্যমে এই শিল্পে উচ্চমূল্য সংযোজন সম্ভব।
বৈঠকে নেদারল্যান্ডসের মন্ত্রী স্যোয়ার্ড স্যোয়ার্ডসমা বাংলাদেশের সঙ্গে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে এবং সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে সরাসরি বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, কৃষিপ্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, শিল্পের আধুনিকায়ন, সামুদ্রিক পরিবহন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় নিজেদের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের সাথে বিনিময় করতে তারা আগ্রহী।
দেশের সার কারখানাগুলোর আধুনিকায়ন ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিখ্যাত ডাচ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান স্ট্যামিকার্বনের সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়েও উভয় মন্ত্রী বিস্তারিত কথা বলেন। এর পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য সবুজ জ্বালানি খাতে যৌথ বিনিয়োগ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং জাতীয় জ্বালানি সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়।
সামুদ্রিক পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থাপনা খাতে চট্টগ্রামের লালদিয়া টার্মিনালসহ অন্যান্য বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক লজিস্টিকস হাব গড়ে তোলা এবং ডাচ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্ভাব্য সরাসরি বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। নদী ও খাল খনন, দীর্ঘমেয়াদি বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত ব-দ্বীপ পানি ব্যবস্থাপনায় নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ডেল্টারেসের প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর প্রস্তাবও বৈঠকে স্থান পায়।
ডাচ উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সুরক্ষায় মেধাস্বত্ব ও আন্তর্জাতিক পেটেন্ট আইন বাস্তবায়ন, কাস্টমস শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার পূর্ণ অটোমেশন এবং ব্যবসা পরিচালনার সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ উন্নয়নের ওপর উভয় পক্ষ আলোচনা করে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, তরুণ ও নারী কর্মীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার রূপরেখা তৈরি হয়।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত নেদারল্যান্ডসের রাষ্ট্রদূত জোরিস ভ্যান বোমেলসহ উভয় দেশের শীর্ষ প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন