মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬,
বাণিজ্যিক সবজি চাষ

কৃষিতে লোকসান নেই যদি সঠিক কৌশল ও বাজার ধরা যায়

কৃষি ডেস্ক

অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ০৬:০২ পিএম

কৃষিতে লোকসান নেই যদি সঠিক কৌশল ও বাজার ধরা যায়

সঠিক পরিকল্পনা, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা এবং প্রতিদিনের বাজার ধরার কৌশলে সবজি চাষে কখনোই লোকসান হয় না।

মানিকগঞ্জের সিংগাইর অঞ্চলের কৃষক গত নয় বছর ধরে এই কৌশল অবলম্বন করে করলা ও লাউ চাষে একের পর এক সাফল্য দেখিয়ে চলেছেন। সপ্তাহে এক বা দুই দিন বড় লটে সবজি তুলে বাজারে পাঠালে হঠাৎ সরবরাহের চাপে দাম পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেই সংকট এড়াতে তিনি প্রতিদিন ভোরে অল্প করে করলা হারভেস্ট করেন এবং নিজস্ব মোটরসাইকেলে করে মানিকগঞ্জের সিংগাইর, পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার বিভিন্ন স্থানীয় বাজার ও পাইকারদের কাছে সরাসরি পৌঁছে দেন। সিংগাইর উপজেলার ১৪টি আড়ত ও স্থানীয় পাইকাররা প্রতিদিন তরতাজা পণ্য পাওয়ায় ন্যায্য দাম নিশ্চিত হয়।

তিনি জানান, করলার বাজারে ধস নামলেও মাঠপর্যায়ে মণপ্রতি দাম কখনোই এক হাজার টাকার নিচে নামে না। অর্থাৎ কেজিপ্রতি ২৫ টাকার নিচে করলা বিক্রি করতে হয় না, আবার অনুকূল মৌসুমে সর্বোচ্চ চার হাজার ২০০ টাকা মণ বা ১০৫ টাকা কেজিতেও বিক্রি হয়।

বাজারে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি আকারের মাঝারি ও ছোট করলার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। ১২ থেকে ১৩টিতে এক কেজি ওজনের এই করলাগুলো গড়ে ৬০ থেকে ৬৫ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে।

সম্পূর্ণ নিরাপদ উপায়ে পরিচালিত এই খামারে কোনো রাসায়নিক কীটনাশক প্রয়োগ করা হয় না। মাটি তৈরির সময় প্রচুর পরিমাণে কেঁচো কম্পোস্ট ও জৈব সার ব্যবহার করে মাটির গুণাগুণ ধরে রাখা হয়েছে। পোকা দমনে ব্যবহার করা হয় দেশি পাটের বীজ ও মেহগনির বীজ ভিজিয়ে তৈরি ভেষজ পেস্ট।

করলার ক্ষেত্রে একই জমিতে মাচা ও বেড নষ্ট না করে ফসল চক্রের কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছে। তরমুজ চাষের জন্য তৈরি করা একই মাচায় কোনো নতুন চাষ ছাড়াই শুধু জৈব সার প্রয়োগ করে করলা রোপণ করা হয়। এতে নতুন করে মাচা তৈরির ৪০ হাজার টাকা খরচ বেঁচে যায় এবং মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচে সাথী ফসল হিসেবে করলা তুলে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। সাধারণত করলা ৯০ থেকে ১০০ দিনের ফসল হলেও গাছের পরিচর্যা ও বয়স্ক পাতা অপসারণের মাধ্যমে তিনি এটি টানা ১২০ দিন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছেন।

একই কৌশলে করলার পাশাপাশি গড়ে তোলা হয়েছে বিস্তৃত লাউয়ের বাগান।

বর্তমানে ৪২ বিঘা জমি নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে কৃষিকাজ পরিচালনা করছেন এই চাষি। লাউয়ের জমিতে কোনো আগাছানাশক ব্যবহার করা হয় না, কারণ বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগ করলে মাটির বন্ধু কেঁচো ধ্বংস হয়ে যায়। গাছ দ্রুত বড় করতে তিনি কোনো বিভ্রান্তিকর পদ্ধতি অনুসরণ না করে কেবল কুশি ছাঁটাই বা প্রুনিং করেছেন এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে ব্যবহার করেছেন মালচিং।

আগের বরবটি চাষের তৈরি মাচাতেই মাত্র সাত হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচে ৬৫ শতাংশ জমিতে তিনি লাউয়ের আবাদ করেছেন। কাটার প্রথম দিনেই ১০৫টি লাউ হারভেস্ট করে ৫৫ টাকা পিস হিসেবে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে। পুরো মাচা পূর্ণ হয়ে উঠলে একদিনেই এক হাজার পিস পর্যন্ত লাউ হারভেস্টের সম্ভাবনা তৈরি হবে।

তিনি জানান, বীজের দাম কোম্পানিগুলো এক বছরে ১৩ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৮ হাজার টাকা করলেও কৃষকের উৎপাদিত ফসলের দাম নিজেরা নির্ধারণ করতে পারে না। এই প্রতিকূল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে টিকে থাকতে হলে নিজস্ব বুদ্ধি খাটিয়ে বহুফসলি মাচা পদ্ধতি ও দৈনিক বাজারজাতকরণের বিকল্প নেই।