অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৭:৫০ পিএম
ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আধুনিক কৃষির ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নীলফামারীতে অসময়ের তরমুজ চাষ করে এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন কৃষক ওমর আলী (৪৫)। গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মাচায় রঙিন জাতের তরমুজ ফলিয়ে তিনি এখন স্থানীয় কৃষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
নীলফামারী সদর উপজেলার লক্ষ্মীচাপ ইউনিয়নের পূর্ব ডাঙাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় নয়নাভিরাম এক দৃশ্য। ওমর আলীর তিন বিঘা জমিতে বাঁশের মাচায় ঝুলছে শত শত হলুদ, গাঢ় সবুজ ও ডোরাকাটা রঙের তরমুজ। পোকার উপদ্রব এবং অতিরিক্ত রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে প্রতিটি তরমুজ জালি বা বিশেষ নেট দিয়ে পরম যত্নে মাচার সাথে বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
আগে এই জমিতে নিয়মিত শসা আবাদ করতেন ওমর আলী। অনলাইনে মাচায় অফ-সিজন তরমুজ আবাদের সাফল্য দেখে তিনি এই নতুন উদ্যোগ নেন। ঢাকার একটি অভিজ্ঞ বীজ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কিং সুগার ও সূর্য ডিম জাতের মোট ছয় হাজার চারা এনে তিনি জমিতে রোপণ করেন। জমি তৈরি, বাঁশের মাচা তৈরি, চারা ক্রয়, প্রতিরক্ষামূলক নেট ও নিবিড় পরিচর্যা বাবদ এ পর্যন্ত তাঁর মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় তিন লাখ টাকা।

বর্তমানে তরমুজ গাছের বয়স ৬০ দিন পার হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আর মাত্র ১০ দিন পর অর্থাৎ ৭০ দিন বয়স পূর্ণ হলেই ক্ষেত থেকে পাকা ফল তোলা শুরু হবে। লাভের আর্থিক হিসাব তুলে ধরে ওমর আলী জানান, প্রতিটি তরমুজের ওজন গড়ে প্রায় তিন কেজি হতে পারে। বাজারে এই অসময়ে প্রতি কেজি তরমুজ পাইকারি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করা সম্ভব। ফলন অনুযায়ী সব তরমুজ সঠিকভাবে বাজারজাত করা গেলে মোট বিক্রি দাঁড়াবে প্রায় নয় লাখ টাকায়। সব ধরনের উৎপাদন খরচ বাদ দিলে মাত্র আড়াই থেকে তিন মাসের পরিশ্রমে তাঁর নিট মুনাফা হতে পারে প্রায় ছয় লাখ টাকা। ইতোমধ্যে উৎপাদিত এসব তরমুজ সরাসরি বিক্রির জন্য ঢাকার পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজারের বড় ব্যবসায়ীদের সাথে প্রাথমিক চুক্তি ও যোগাযোগ সম্পন্ন করেছেন তিনি।
মাচায় এই ভিন্নধর্মী ফলন দেখে আশপাশের চাষিদের মাঝেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেশী কৃষক জগদীশ রায় জানান, এই এলাকায় বাঁশের মাচা তৈরি করে এমন রঙিন ও অসময়ের তরমুজ আবাদ আগে কখনো কেউ দেখেনি। ওমর আলীর ক্ষেতের সফল অবস্থা দেখে গ্রামের অনেক কৃষকই আগামী মৌসুমে এই উচ্চমূল্যের ফসল চাষের পরিকল্পনা করছেন।
তবে নতুন প্রযুক্তির এই চাষাবাদে কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। ওমর আলী উল্লেখ করেন, অসময়ের আবহাওয়ার কারণে ফলের বোঁটা পচে যাওয়া ও ছত্রাকের সংক্রমণ ঠেকানো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য সুষম সার ও নির্ধারিত মাত্রার বালাইনাশক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
কৃষি বিভাগ থেকে মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।
নীলফামারী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোছা. হোমায়রা মন্ডল জানান, অফ-সিজনে বাজারে তরমুজের প্রচুর চাহিদা ও তুলনামূলক চড়া দাম থাকে। কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে ওমর আলীর ক্ষেত সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন এবং রোগবালাই প্রতিরোধসহ মানসম্মত ফলন নিশ্চিত করতে সার্বিক কারিগরি পরামর্শ দিচ্ছেন। স্থানীয় কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মাচায় এই রঙিন তরমুজ চাষ জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন