শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৬,

তরুণ ভোটারদের আস্থা হারাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির ক্ষোভ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

অক্টোবর ১৬, ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম

তরুণ ভোটারদের আস্থা হারাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির ক্ষোভ

ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টির ওপর থেকে দেশটির তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের একটি বড় অংশ নিজেদের আস্থা ও সমর্থন প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

অর্থনৈতিক অস্থিরতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাপক আকারে অভিবাসীদের ধরপাকড়, বিদেশের যুদ্ধ এবং নারীদের প্রতি প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে গভীর অসন্তোষ থেকেই এই দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ক্ষুব্ধ তরুণদের অনেকে আসন্ন নির্বাচনে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন করার চিন্তা করছেন, আবার কেউ কেউ পুরোপুরি ভোটদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

দুই বছর আগে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্পকে ব্যালটে সমর্থন জানানো অসংখ্য তরুণ-তরুণী এখন নিজেদের সেই সিদ্ধান্তের জন্য প্রকাশ্যে অনুশোচনা প্রকাশ করছেন। তাঁদের দাবি, নির্বাচনের আগে ট্রাম্প যেসব অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ক্ষমতাসীন হওয়ার পর তার সিংহভাগই বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন।

নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক যৌথ জনমত জরিপের বিশ্লেষণে এই পরিবর্তনের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ পুরুষ ভোটারদের ৫৫ শতাংশ সরাসরি ট্রাম্পকে সমর্থন দিয়েছিলেন, যা ছিল রিপাবলিকানদের জন্য একটি ঐতিহাসিক উল্লম্ফন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই সমর্থনে বড় ধস নেমেছে। বর্তমানে তরুণ পুরুষ ভোটারদের পছন্দে ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের চেয়ে এক শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে গেছে। একই সাথে ২০২৪ সালে ট্রাম্পের পক্ষে থাকা তরুণীদের মধ্যে রিপাবলিকান সমর্থন ৩১ শতাংশ থেকে নেমে মাত্র ১৩ শতাংশে ঠেকেছে।

জীবনযাত্রার চড়া ব্যয় নিয়ে তরুণদের মাঝে ক্ষোভ দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

আইওয়ার ডেস মইনসের ২৬ বছর বয়সী বিক্রয়কর্মী মাইকেল জনসনের উদাহরণ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। লাইবেরিয়ায় জন্ম নেওয়া জনসন ১৫ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ডেমোক্র্যাটদের বিতর্কিত লিঙ্গনীতির বিরোধিতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০২৪ সালে নিজের পরিবারের ১৫ জন সদস্যকে নিয়ে ট্রাম্পকে ভোট দিয়েছিলেন। তবে এখন তাঁর অবস্থান পুরোপুরি উল্টে গেছে। জ্বালানি ও আবাসন ব্যয় মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তিনি দিনে প্লাস্টিক কারখানায় কাজের পাশাপাশি রাতে হোল ফুডসে দ্বিতীয় চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর সাতজন বন্ধুকেও একইভাবে টিকে থাকার জন্য অতিরিক্ত কাজ নিতে হয়েছে। অন্যদিকে তাঁর মায়ের পরিচালিত আফ্রিকান পণ্যের দোকানের ভাড়াও বহুগুণ বেড়ে গেছে। জনসন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর রিপাবলিকানদের ব্যালটে সমর্থন দিতে পারবেন না।

ক্যালিফোর্নিয়ার ওকভিলের ২১ বছর বয়সী মারকোস জিমেনেজও ভালো অর্থনীতির আশায় ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলেন।

জিমেনেজের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, দেশের অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার সংকট সমাধানের চেয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সম্পূর্ণ মনোযোগ এখন বিদেশের যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের দিকে। তাই আসন্ন নির্বাচনে সাধারণ মানুষের স্বার্থ সুরক্ষায় তিনি ডেমোক্র্যাটদের ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নীতিও বিশ্বস্ত ভোটারদের দূরে ঠেলে দিচ্ছে।

পশ্চিম কানসাসের গার্ডেন সিটির বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী হিস্পানিক বংশোদ্ভূত রেমি মার্টিনেজ ডেমোক্র্যাটদের অতিরিক্ত উদারনীতির প্রতিবাদে গত নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের পাইকারি অভিবাসীবিরোধী অভিযানে তিনি ক্ষুব্ধ। মার্টিনেজ জানান, অপরাধীদের তাড়িয়ে দেওয়ার নীতি সমর্থনযোগ্য হলেও দীর্ঘ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ঘাম ঝরানো পরিশ্রমী সাধারণ মানুষকেও রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাংস প্রক্রিয়াকরণ শিল্পনির্ভর তাঁদের শহরে যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে আটকের কারণে জনজীবন বিপর্যস্ত। তাই ক্ষমতার ভারসাম্য ফেরাতে তিনি কানসাসের সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকোকে ভোট দিতে নিজের বিশোর্ধ্ব মেয়েকেও পরামর্শ দিচ্ছেন।

তরুণীদের মধ্যে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা হ্রাসের পেছনে কাজ করছে সামাজিক অনুশাসন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।

টেক্সাসের ২২ বছর বয়সী সুজানা ব্রিজেস রক্ষণশীল ক্যাথলিক পরিবার থেকে এসে ২০২৪ সালে প্রথমবার ভোট দিয়ে ট্রাম্পকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশি মিত্রদের সাথে দূরত্ব তৈরি, বহির্বিশ্বের সাহায্য হ্রাস এবং হোয়াইট হাউস থেকে গণমাধ্যমকে দূরে ঠেলে দেওয়ার ঘটনায় তিনি হতাশ। বিশেষ করে জেফরি এপস্টেইন সংক্রান্ত গোপন নথি নিয়ে ট্রাম্পের অস্বচ্ছ অবস্থান এবং নারীদের প্রতি প্রশাসনের চরম পুরুষতান্ত্রিক আচরণ তাঁকে বিমুখ করেছে। তিনি নিজেকে খ্রিষ্টীয় জাতীয়তাবাদী নয় বরং নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল ক্যাথলিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে জানান, ডেমোক্র্যাট নেতা জেমস টালারিকোর ধর্মনীতি ও অবস্থান পরিবর্তনের কারণে তাঁদের ওপরও তাঁর আস্থা নেই। তাই তিনি ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ব্যয়সংকটে জর্জরিত তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ এখন সমাজতান্ত্রিক ধারার বিকল্প রাজনীতির প্রতি ঝুঁকছে।

নিউ হ্যাম্পশায়ারের ২৬ বছর বয়সী লিয়াম হাওয়ার্ড এর বড় দৃষ্টান্ত। সাবেক এই রিপাবলিকান কলেজ জীবনে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টান। বর্তমানে যানবাহনের জরুরি বাতি তৈরির কারখানায় সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা কাজ করেও তিনি একটি সাধারণ স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য রাখেন না এবং বাধ্য হয়ে মা-বাবার আশ্রয়ে থাকছেন। এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাঁকে ভারমন্টের স্বতন্ত্র সমাজতন্ত্রী সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এবং নিউইয়র্কের ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের রাজনীতির দিকে আকৃষ্ট করেছে।

জরিপ অনুযায়ী, তরুণ ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ বর্তমানে গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী নেতৃত্বকে পছন্দ করছেন, যা যেকোনো বয়স্ক গোষ্ঠীর চেয়ে বহুগুণ বেশি।

অবশ্য তরুণদের সবাই দল পরিবর্তন করছেন এমন নয়। তরুণ পুরুষদের এখনও ৪৪ শতাংশ রিপাবলিকানদের পক্ষে রয়েছেন। অ্যারিজোনার ফিনিক্সের ২৮ বছর বয়সী তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবসায়ী কনার ফ্রেডরিকসন মনে করেন, ট্রাম্প দেশকে স্বাবলম্বী করার লড়াই করছেন এবং কোনো নেতাই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত হতে পারেন না।

আবার কানসাস সিটির ২৫ বছর বয়সী রিপাবলিকান সমর্থক রায়ান গেলিংসের মতো তরুণরা মনে করেন, দলীয় নেতারা ট্রাম্পের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত। তাই সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের ব্যয় কমাতে আন্তরিক যেকোনো নেতা—হোন তিনি নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি, বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ কিংবা ভিন্নমতের রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি—তাদের প্রতিই মানুষের আসল সমর্থন বাড়ছে।

জরিপে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের এক-তৃতীয়াংশই মনে করেন, দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কেউই সাধারণ মানুষের মূল সংকটকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

বয়স্কদের মতো তরুণ ভোটারদের কোনো স্থায়ী দলীয় আনুগত্য নেই; বরং অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা ও বাস্তব সংকটের নিরিখে তাঁদের সিদ্ধান্ত দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তবে এই অসন্তোষ ভোটকেন্দ্রে কতটা রূপান্তরিত হবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যেখানে ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন, সেখানে ৩০ বছরের কম বয়সীদের উপস্থিতির হার ছিল মাত্র ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে আসন্ন নির্বাচনে তরুণদের ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ব্যালটে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয়ের জন্যই একটি বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।