রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২৬,

এআই যুগে চাকরির সংকট যেভাবে কাটবে

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম

এআই যুগে চাকরির সংকট যেভাবে কাটবে

শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ বেকারত্বের কবলে পড়ছেন, অথচ প্রযুক্তি খাতের দ্রুত প্রসারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে না। এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের যুগে তরুণদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি অর্জনের বাইরে গিয়ে ব্যবহারিক দক্ষতা, পরামর্শদান এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরির তাগিদ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

তরুণদের মেধা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকর কর্মসংস্থানে রূপ না নেওয়ার কারণ কাঠামোগত দুর্বলতা।

চিরাচরিতভাবে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে কেবল নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, প্রকল্প ঘোষণা বা কমিটি গঠনের মতো ধীরগতির প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করা হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় চলে যায়, যার ফলে কর্মপ্রত্যাশী তরুণদের জীবনের মূল্যবান সময় অপচয় হয়। এই সীমাবদ্ধতার মুখে আশা দেখাচ্ছে স্থানীয় ও কমিউনিটিভিত্তিক মডেল।

আফ্রিকার ১১টি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা ‘কর্পসআফ্রিকা’ তরুণ গ্র্যাজুয়েটদের স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে প্রশিক্ষণ দিয়ে সরাসরি সম্পৃক্ত করছে, যা মূলধারার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় অনুপস্থিত থাকা ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করছে।

একই ধরনের সফল উদাহরণ তৈরি হয়েছে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে।

সেখানে মাইক্রোসফট লার্ন স্টুডেন্ট অ্যাম্বাসেডর কর্মসূচি ও গ্লোবাল শেপার্স পেশোয়ার হাবের সহায়তায় একটি অনুকরণীয় প্রশিক্ষণ মডেল চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো একজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আরও ১০ জনকে গড়ে তোলার দায়িত্ব প্রদান। গত চার বছরে কোনো সরকারি তহবিল বা আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার সাহায্য ছাড়াই কেবল শিক্ষার্থী ও তরুণ পেশাজীবীদের স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এক হাজারের বেশি তরুণের কাছে প্রশিক্ষণ পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। কম খরচে স্থানীয় চাহিদামাফিক পরিচালিত এই পদ্ধতি বৃহৎ পরিসরে রূপান্তরযোগ্য।

তবে তৃণমূলের এসব উদ্যোগ একা পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক তদারকি, ধারাবাহিকতা এবং আর্থিক কাঠামোর ঘাটতির কারণে অনেক সময় এসব উদ্যোগ থমকে যায়। তাই স্থানীয় উদ্যোগের পাশাপাশি একটি সুসংগঠিত ক্যারিয়ার পরামর্শক ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

শ্রমবাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের গবেষণা বলছে, বিশ্বের তরুণ কর্মীদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি বর্তমানে এমন পেশায় যুক্ত রয়েছেন যা এআই প্রযুক্তির কারণে সরাসরি বদলে যেতে পারে। এআই মূলত কর্মজীবনের শুরুর পর্যায়ের সেই প্রবেশিকা পদগুলো সংকুচিত করছে, যার মাধ্যমে নবীনরা অতীতে হাতে-কলমে কাজ শিখে অভিজ্ঞতা অর্জন করতেন। অথচ বিশ্ব ফোরামের ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কর্মশক্তির ২২ শতাংশ কাঠামোগত পরিবর্তনের মুখে পড়বে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, বিশ্বের মোট শ্রমশক্তির ৮০ শতাংশ গ্লোবাল সাউথ বা উন্নয়নশীল অঞ্চলে বাস করলেও প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের বৈশ্বিক আলোচনা কেবল ধনী দেশগুলোকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে।

পাকিস্তানের বেকারত্বের পরিসংখ্যান এই সংকটের গভীরতা স্পষ্ট করে তোলে। গ্যালাপ পাকিস্তানের লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪-২৫ বিশ্লেষণ থেকে জানা যায়, দেশটিতে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। সামগ্রিক জাতীয় বেকারত্ব ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ হলেও শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের ক্ষেত্রে এই হার ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীরাই বেশি সময় ধরে কাজের অপেক্ষায় থাকছেন।

তথ্যপ্রযুক্তি খাতেও তৈরি হয়েছে চরম বৈপরীত্য।

পি@এসএইচএ স্কিলস সার্ভে ২০২৫ অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা কমিশন অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তিতে স্নাতক সংখ্যা ২০২৪ সালের ২৮ হাজার ৯১ থেকে বেড়ে ২০২৮ সালে প্রায় ৬২ হাজারে উন্নীত হতে পারে। কিন্তু ২০২৪ সালে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো ৭২ হাজার ৯৫২ জন প্রার্থীর মধ্য থেকে নিয়োগ দিতে পেরেছে মাত্র ১৩ হাজার ৩৫০ জনকে। অর্থাৎ মাত্র ১৮ দশমিক ৩ শতাংশ নতুন স্নাতক সংশ্লিষ্ট খাতে যুক্ত হতে পেরেছেন এবং বাকি চার-পঞ্চমাংশ কাজ পাননি।

দক্ষতার এই সংকটের পেছনে অপর্যাপ্ত বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণও দায়ী।

পাকিস্তানে মাত্র ৭ শতাংশ তরুণ আনুষ্ঠানিক বৃত্তিমূলক ও কারিগরি শিক্ষার সুযোগ পান, যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক গড় ২২ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় দক্ষতার এই শূন্যতার ফলে উৎপাদনশীলতা ও রপ্তানি পিছিয়ে থাকায় পাকিস্তানের অর্থনীতিতে বছরে ৩১ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তরুণীদের অর্ধেকের বেশি শিক্ষা, চাকরি বা কোনো প্রশিক্ষণেই যুক্ত নেই।

দুবাইয়ে অনুষ্ঠিতব্য গ্লোবাল ফিউচার লিডার্সের বার্ষিক সম্মেলনে প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়ে এই প্রশ্নগুলো বিশ্বনেতাদের সামনে তুলতে যাচ্ছেন গ্লোবাল শেপার্স কমিউনিটি পেশোয়ার হাবের কিউরেটর রোহাইল ইকবাল। তার মতে, তরুণদের কেবল বিদেশে পাঠানো বা প্রতীকী বৃত্তি নয়, বরং স্থানীয় প্রতিভাকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে সংযুক্ত করতে ক্যারিয়ার অবকাঠামো ও পরামর্শ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই এআই যুগের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।